রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

জাহেদ মোতালেব সাধারণত লিটল ম্যাগাজিনেই গল্প লিখে থাকেন। খেলাবুড়া তার প্রথম গল্পগ্রন্থ। এতে গল্প আছে ৮টি- ‘গবিয়াল’, ‘খেলাবুড়া’, ‘টেংরাকাহিনী’, ‘বউ পালানো বিরহ’, ‘বিবাহ’, ‘কালোপাহাড়’, ‘বানরতাড়িত’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘আঁধা’। আমাদের চেনাজানা অনেক ধারণাই গল্পকার ভাংতে চেয়েছেন তার গল্পে – বলা যায় ছোটগল্পের ছকে-বাধা-জগৎ বেশ কিছুটা অচেনা হয়। গল্পের ট্রাডিশনাল ফর্ম থেকে পাওয়া সেই ধারণাসমূহ – যেমন, ভূমিকা, কাহিনীর উলে­খ, ক্লাইমেক্স, শেষে একধরনের উপদেশ দেয়া ইত্যাদির তেমন ধার ধারেননি তিনি। তবে তিনি এ ধরনের সাজানো-গুছানো ছক থেকে ষোল আনা বেরিয়ে আাসতে পেরেছেন, তাও সঠিক নয়।  তবে এ কথা সত্যি যে, গল্প সম্পর্কে পরিচিত অভ্যাস, গল্পপাঠের পরিচিত  আয়োজন ব্যাহত হয়েছে বারবার। কখনো এমন মনে করাতে পারেন যে, এ-সময়ের গল্প থেকে কথক আর পাঠকের ব্যবধান যেন ক্রমশ বাড়ছে!

তিনি গল্পে খণ্ডচিত্র আকেন। তাতে তার ধৈর্যহানির বিষয়টিও কখনও কখনও তার ঘটে, তবে এটিই তার স্টাইল-যা ক্রমাগত তিনি করে যাচ্ছেন। গবিয়াল  গল্পটির কথাই ধরা যাক, এখানে বেশ কিছু খণ্ডচিত্র তিনি আলঅদা আলাদা করে এনেছেন, কবিয়াল সম্পর্কে মানুষের ব্যবসায়িক মনেবৃত্তি, রূপকথার আদলে একালের দস্যুবৃত্তির বয়ান, কিচ্ছার সাথে গ্রামীণ কবিয়ালের সংশ্লেষ ইত্যাদি তিনি এক গল্পে ধারণ করেছেন। খেলাবুড়া নামের গল্পে শহুরের পথেঘাটে ঘাটে জাদু দেখিয়ে সংসার চালানোর যন্ত্রণাদায়ক  বর্ণনা আছে গল্পটিতে। গল্প তিনি মাুষের নানাবিধ আচরণের উপর কথার উপর হেয়ালির উপর ছেড়ে দেন। তবে তার গল্পে সেন্ট্রাল পয়েন্ট একটা থাকে। যেমন এখানে খেলা দেখানো বুড়ার মানসিক যাতনাই মুখ্য। গল্পটি শেষ হয় এভাবে – ’পাদ দিয়ে কুকুর তাড়ানো শেয়ালের ভঙ্গিতে মাছের মতো ভেজা ও আঁষটে গন্ধের কলোনিতে ঢোকে।’ এভাবেই অসংখ্যা ফুটেজ সহযোগে তিনি তার ছোটগল্পরূপী শট্যফিল্মটি তিনি শেষ করেন। আচ্ছা, গল্পে চট্টগ্রাম শহরটি তো স্পষ্ট, তাহলে এর ২ নম্বর বাসটি কি দেওয়ানহাটের দিকে যায়?

‘কালোপাহাড়’ মসজিদকেন্দ্রিক গল্প – এটি ১০০ বছরের পুরনো, বৃটিশ আমলের – প্যাঁচি মানুষ আব্দুল করিম মুন্সি যার প্রতিষ্ঠাতা। এখন এর তদারকিতে আছে চারটি পরিবার। এদের ভিতরই ওয়াক্ফ করা, সম্পত্তির দাবি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাগতিক চেতন ইত্যাদির জন্য প্রতি জুম্মাবার এসব নিয়ে মেলা ঝগড়া। তবে এ বিষয়টি মেনে নেয়া মুশকিল যে, মুসলি­দের ভাবনা আগে যা ছিল তা এখনো অর্থাৎ ১০০ বছর পরেও তাই আছে। লালমুখো ইংরেজ গেল, দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধ গেল, দেশভাগ হলো- উপনিবেশ বিদায় নিল, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজির বিকাশ, স্বাধীন দেশেও নতুন আঙ্গিকে উপনিবেশ জেকে বসল, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক-বেসামরিক নানামাত্রার স্বৈরশাসন – তারপরও একটা জাতিগোষ্ঠী একই ভাবনা কী করে থাকবে? আবহমান বাংলার কথিত ঐতিহ্য থেকে গল্পকারের এমনই জীবন-পাঠ ! মসজিদ নিয়ে গড়ে উঠা নানাবিধ সামাজিক বিষয়, দ্বন্দ্বকে গল্পকার দেখেছেন একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে, তার এ অবজার্ভেশন, সোশ্যাল স্টাডি বেশ চমৎকার। গল্পটি দূর থেকে দেখে-দেখে লেখার উপলব্ধজাত মনে হয়নি; এটাই তার বড়ো ক্রেডিট। তবে ধর্মীয় আচার-আচরণ বর্ণনায় আরও বিস্তুতভাবে করলে গল্পের রেশ আরও স্পষ্ট হতো। ধর্মীয় জীবনে অনেক সময় অযাচিত বাড়াবাড়ি থাকে কারও কারও, কিন্তু সামাজিক জীবন বর্ণনায় ধর্মের অনুষঙ্গগুলো কথিত অনেক প্রগতিশীল গল্পকারই বেশ উন্নাসিক।

তিনি গল্পে নিজেকে দারুণ অস্থিরতায় নিমজ্জন করেন যেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ নামের গল্পে। এমনকি বুর্জোয়া রাজনীতির ফাকা মানবিকার উপর একধরনের ঘৃণা প্রকাশ করেন আঁধা নামের গল্পে। বউ পালানো বিরহ নামের গল্পে একজন বিরহী পুরুষের যন্ত্রণা যেমন আছে; তেমনি এর প্রায় বিপরীত-যন্ত্রণার গল্প হচ্ছে বিবাহ নামের গল্পে। এ গল্পে একজন নারীকে বিয়ে নামের হাটে কত যে অপদস্থ হতে হয়, নিজেকে নানান অনুষ্ঠানে কত ছোট হতে হয়, কন্যাদায়গ্রস্ত মুরুব্বিগণ কত যে যন্ত্রণায় থাকেন; এ তারই নিপুণ বয়ান। রূপকথা কখনও এ কালের জান্তবতার সাথে একেবারে মিশে যায় তার গল্পে। টেংরাকাহিনী, গবিয়াল ইত্যাদিতে তিনি তাই প্রকাশও করেছেন। বানরতাড়িত গল্পে বিধবার করুণ আর্তনাদ প্রকাশ করেছেন। প্রকাশ করেছেন সাদ্দামের যুদ্ধকাহিনীতে মানুষের ভোগান্তিও কথা।

জাহেদ মোতালেব এভাবেই নানান খণ্ডকথনের ভিতর দিয়ে আলাদা এক জগৎ নির্মাণ করেছেন। এর ভাষা প্রাতিষ্ঠানিকতা মানেনি। গল্পে পরিচিত গল্পলালিত্য নেই। তার গল্প পড়তে হবে গল্পের আরেক ধরনকে চেনার জন্য, যেন তার যন্ত্রণার ভাগীদার হ্ওয়ার জন্য। সবচেয়ে বড়ো কথা, কতক অক্ষও, বাক্য, শব্দ সহযোগে তাকে চেনানো যাবে না। এর জন্য অতি জরুরি হচ্ছে তাকে পাঠ করা।

খেলাবুড়া
জাহেদ মোতালেব
প্রকাশক: প্রসুন্ন কুমার দাশ ফাউন্ডেশন
প্রকাশকার: বইমেলা ২০১১
প্রচ্ছদ পরিকল্পনা : রিপন মিনহাজ
ধরন : গল্পগ্রন্থ
পৃষ্ঠা : ৮০, দাম : ১০০ টাকা

মন্তব্য, এখানে...
Share.

জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার জ্ঞানপুর গ্রামে, মামাবাড়িতে ১৯৬৩ সালে। সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে উজ্জীবিত বাজিতপুর এবং নাটকপাগল গ্রাম সরিষাপুরে জন্মগ্রহণের সুবাদে ছোটবেলাতেই সাংস্কৃতিক জীবনের হাতেখড়ি হয়। স্কুল-কলেজের ওয়াল ম্যাগাজিনে লেখালেখির মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়। তার ধারাবাহিকতা ছিল মেডিকেল কলেজেও। ২য় বর্ষে পড়াকালিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাহিত্য বিভাগ থেকে স্বরচিত গল্পে ৩য় স্থান অধিকার করেন। এটিই খুব সম্ভবত কোন সাহিত্য রচনার জন্য প্রথম স্বীকৃতি লাভ। প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ১৯৯৮ সালে মুক্তকন্ঠ-এ। প্রকাশিত গল্পের নাম ‘জলে ভাসে দ্রৌপদী। পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে ৫টি গল্পগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ৪টি গদ্য/প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং ১টি সংকলিত সাক্ষাৎকার। তাঁর প্রকাশিত বই: মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৫, জাগৃতি প্রকাশনী)। পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০০৬, মাওলা ব্রাদার্স)। স্বপ্নবাজি (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ)। কতিপয় নিম্নবর্গীয় গল্প (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রæয়ারি ২০১১, শুদ্ধস্বর)। উপন্যাসের বিনির্মাণ, উপন্যাসের জাদু (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১১, জোনাকী)। যখন তারা যুদ্ধে (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, জোনাকী)। গল্পের গল্প (গদ্য/প্রবন্ধ, একুশে বইমেলা ২০১৩, জোনাকী)। কথাশিল্পের জল-হাওয়া (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর)। ভালোবাসা সনে আলাদা সত্য রচিত হয় (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, জোনাকী)। দেশবাড়ি: শাহবাগ (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুদ্ধস্বর)। কথা’র কথা (সংকলিত সাক্ষাৎকার, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, আগামী)। জয়বাংলা ও অন্যান্য গল্প (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, জোনাকী)। কমলনামা (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বেঙ্গল)। হৃদমাজার (উপন্যাস, ডিসেম্বর ২০১৫, অনুপ্রাণন প্রকাশন), খুন বর্ণের ওম (উপন্যাস, ফেব্রæয়ারি ২০১৮, ঘোড়াউত্রা প্রকাশন)। সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘কথা’ প্রকাশিত সংখ্যা ৯টি (২০০৪-২০১৪)। ২০১১ সালে ‘কথা’ লিটল ম্যাগাজিন ‘শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিন প্রাঙ্গণ’ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি (মরণোত্তর)।

Leave A Reply