রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

৬১৯ পৃষ্ঠার অপরাধ ও শাস্তি যথন পড়তে মনস্থ করি, তখনও বারবার মনে হয়েছিল, এত কথা, এত কথার প্যাঁচ, এত ন্যারেশন, এই সময়ে, কথাসাহিতের এই জাদুময়তা, এই সাঙ্কেতিকতার যুগে পড়ব কী করে? তবু পড়তে চাই, ফিউদর দস্তয়ভস্কি (১৮২১-১৮৮১) এই উপন্যাসটির কথা এতবার শুনেছি, শুনতে শুনতেই এর প্রতি তীব্র মোহে পড়ে যাই। মনে মনে অনেকদিন খুঁজেছিও। এখন তো মস্কোর প্রগতি বা রাদুগা নেই, সেই জৌলুশ নেই, নেই প্রচারণা। মাঝে মাঝে ফুটপাতের বইয়ের দোকানে রাশান সাহিত্য দেখি। তবে আর তা দেখারও ইচ্ছা হয় না; কেবলই সেইসব দিনের কথা মনে হয়, সেইসব পাঠের কী যে উন্মাদনা ছিল একসময়। গ্রন্থটি হঠাৎই আমার নজরে আসে। কলকাতা সাহিত্য আকাদেমি থেকে প্রকাশিত দেবেশ রায়ের অতি মনোহর একটা ভূমিকাসহ গ্রন্থটি সংগ্রহ করি। 

আমি যখন রাশান কথাসাহিত্য পড়তে শুরু করি, তখনও স্বভাবতই গোগলের ওভারকোর্ট-এর কথা মনে পড়ে। ফিউদর দস্তয়ভস্কিই নাকি একবার বলেছিলেন, রাশান আধুনিক কথাসাহিত্যের সবই বেরিয়েছে গোগলের ওভারকোর্ট থেকে। যাই হোক, প্রেস্টুপ্লেনিয়ে ই নাকাজানিয়ে মানে অপরাধ ও শাস্তি (তার অন্যান্য উপন্যাস হচ্ছে ব্রাদার্স কারমিজভ, ইডিয়ট, লাঞ্ছিত বঞ্চিত, জুয়াড়ি ইত্যাদি) পড়তে পড়তে তা তেমন মনে হয়নি। কিছু মনগত কিছু আর্থসামাজিক অবস্থা হয়ত থাকতে পারে। তবে তিনি, দস্তয়ভস্কি, পৃথিবীর নামজাদা সাহিত্যিকদের উপর বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। বিশেষ করে তিনি তার নিম্নবর্গীয় মনস্তাত্ত্বিক অনুভব দিয়ে তা করতে পেরেছেন। যাই হোক, এ গ্রন্থ পাঠে মনে হচ্ছে, অপরাধজগতের এমন এক বিস্তৃত সরল কাব্য পড়ছি, যা একালের এক নবতর টেস্টমেন্ট যেখানে খুনির মতো অপরাধীর প্রতি ভালোবাসা জন্মে, তার খুনের ভাগীদার হতে ইচ্ছা করে! সেই খুনির নাম রাসকলনিকভ। ঘটনা অতি সাধারণ, একসমসয়কার ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট, টাকার অভাবে একটা ৫ তলা ফ্ল্যাটবাসার একটা অতি সাধারণ চিলেকোঠা টাইপের রুমে থাকে। টিউশনিও বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সে পড়াশুনাও চালিয়ে যেতে পারে না। এদিকে তার প্রিয়তম বোনের বিয়ে ঠিক হয় এমন একজনের সাথে যাকে সে মোটেই পছন্দ করতে পারে না। তার মায়ের চিঠি পড়ে তার মনে হয় বোন দুনিয়া ওই আত্মম্ভরি লোভী লোকটাকে বিয়ে করছে শুধুমাত্র তার ভাইয়ের সুখের জন্য। তখন সে সুদখোর বুড়ির কাছে যায়, তাকে কুড়ালের উল্টাপিঠ দিয়ে আঘাত করে হত্যাকরত তার টাকাকড়ি সম্পদ নিয়ে আসার পরিকল্পনা করে, কিন্তু বুড়িকে হত্যার সময়ই তার নাতনি চলে আসাতে তাকেও সে হত্যা করে সে। এখানেই শুরু হয় ঘটনার নানান মোচড়, সন্দেহ, প্রতিসন্দেহ, থানাওয়ালাদের টানাহ্যাঁচড়া। ঘটনাটি ঘটে এমন এক জায়গায় যেখান থেকে বুড়ির বাসা ৭৩০ পা, থানার অবস্থান বিপরীত দিকে, অনেকটা একই দূরত্বে। কিন্তু মামমলার কোনোই কুলকিনারা হয় না। কারণ এর কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। কিন্তু রাসকলনিকভ তীব্র মর্মপীড়ায় ভুগতে থাকে। কোথাও সে শান্তি পায় না। আবার যে কারণে বুড়িকে হত্যা করল, সেই কারণ, অর্থাৎ টাকা-কড়ির দিকেও তার নজর নেই। বুড়ির মানিব্যাগ বা তার জিনিসপত্র সে ব্যবহারই করে না। একটা ভাঙ্গা বাড়ির ভিতরে ভাঙ্গা দেয়ালের নিচে মানিব্যাগ ও জিনিসপত্র চাপা দিয়ে রাখে। একসময় তার প্রেম গড়ে ওঠে সোনিয়া নামের এক বিচিত্র স্বভাবের এক রমণীর সাথে। ওর বাবা ঘোড়ার গাড়ির নিচে পড়ে গিয়ে একপর্যায়ে মারা যায়। তার অন্ত্র্যেষ্টিক্রিয়ায় সে ৫০ রুবল দিয়ে সাহায্য করে। এ নিয়ে দুনিয়ার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়া পিওতর পেত্রোবিচ্ লুজিন নামের লোকটি গ্যাঞ্জাম পাকায়। সোনিয়ার প্রতি রাসকলনিকভ-এর আসক্ত হওয়ার বদনেশার কথা বলে। মূলত রাস্কোল্নিকভ্ তখনও সোনিয়াকে ভালোভাবে চেনেই না।

রাসকলনিকভ তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বই এ ঘটনার বড়ো সাক্ষী হয়ে যায়। কারণ বুড়ির ফ্ল্যাটের লোকজন, থানার লোকেরা তাকেই সন্দেহ করতে থাকে। একপর্যায়ে সে সোনিয়ার কাছে এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। তা আবার আরেক দুশ্চরিত্র স্ভিদ্রিগাইলভ দরজার আড়ালে থেকে এ কথা শুনে ফেলে। সে তা নিয়ে তার মনস্কাম পূর্ণ করতে চায়। কারণ ওর অন্যতম কাজই হচ্ছে মেয়েমানুষ ভোগ করা। এর জন্য পটানোনোতে তার জুরি নেই। তো, একসময় দুনিয়া তার বাসায় গভর্নেস হিসাবে কাজ করত। তখনই তাকে ভোগ করার কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। তখন দুনিয়া ওই বাসা থেকে চলে এসেছিল। কিন্তু এই পর্যায়ে সে দুনিয়াকে ভোগের কথা বলে, নতুবা তার ভাইকে ফাঁসিয়ে দিবে বলে ভয় দেখায়। কিন্তু তাতে দুনিয়া টলে না, বরং তাকে পিস্তল দিয়ে খুন করতে উদ্যত হয়। অনেক ধ্বস্তাধস্তি, অনেক ঘটনার পর সে বদ্ধ রুম থেকে ছাড়া পায়। দুনিয়ার সম্পর্ক হয় রাজকলনোকিভের একান্ত বন্ধু রাজুমিখিনের সাথে। কোনো একসময় তাদের বিয়েও হয়।

তবে এতসবের পরেও রাসকলনিকভের মনোযন্ত্রণা কমে না। সে একপর্যায়ে থানায় যায়, সোনিয়ার পরামর্শ মোতাবেক মাটি ছুঁয়ে দেশকে প্রণাম জানায়। খুনের কথা প্রকাশ করে, কোনো রাখঢাক না করে সবই বলে যায়। সাক্ষীরও তেমন প্রয়োজন হয় না। তার চরিত্রের নানান পজেটিভ দিক দেখে বিচারকরা তাকে আটবছরের শাস্তি প্রদান করেন। তাও শেষ হয়, তার মুক্ত হওয়ার পথ হয় উন্মুক্ত।

এ উপন্যাসটির বড়ো শক্তিই হচ্ছে বর্ণনার চমৎকার জগৎ। খুনির কাছ থেকে আমাদের দৃষ্টি একফোঁটাও সরে না। এমন এক প্রাজ্ঞ লোক, লেখক কেন এমন একটা কাজ করতে গেল তা নির্ণয় করতে করতেই উপন্যাস শেষও হয়। রাস্কোল্নিকভ্ তো অর্থের প্রলোভনে খুন করেনি। ক্ষণকালের পাগলামিও তা নয়। একটা কফিনের মতো বাসা, কষ্টের জীবন, নতুন কিছু করে দেখানোর বাসনায় হয়ত খুনের একটা কারণ হতে পারে। আসলে এই খুনের ফলেই যেন এই সমাজের বদ্ধ-পরিবেশকে একেবারে খোলাশা করে দেখানো হয়ে গেল। রাসকলনিকভ প্রত্যহ নিজেকে নির্মাণ করতে চায়, দেখতে চায়। আবিষ্কার করতে চায়। এই হয়ত খুনের আসল মাজেজা। রাস্কোল্ মানেই হচ্ছে ভেঙে ভেঙে দ্বিধাবিভক্ত হওয়া। তার চরিত্র এখানে ভাঙচুর হতে হতে প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করে, পাল্টা প্রতিষ্ঠান বানায়। তার ভিতরে ঈশ্বরত্ব ডেভলপ করে। যা কিছু চলমান, উনবিংশ শতকের রাশিয়ার সমাজে এক-একটা অনড় বিষয়-আশয় থাকে! তাই সে যেন তছনছ করে ফেলতে চায়। এক নৈরাজ্যিক বিহ্বলতা সে বহন করতে থাকে। আর উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের জার শাসন-ত্রাসনের দমিত-মথিত-হতবিহ্বল সেই রাশিয়া একেবারে প্রত্যক্ষ হতে থাকে।

মায়াময় শ্বাসরদ্ধকর এ এক কাহিনী যেখানে খুনির প্রতি চরম ভালোবাসায় পাঠক সর্বদা আর্দ্র হয়ে থাকার কথাÑএকজন খুনির প্রতি অত বিকল্প সত্য প্রকাশের মমতা বিশ্বাসাহিত্যের আর কোনো উপন্যাসে আছে কিনা সন্দেহ। অরুণ সোমের অনুবাদ অতীব চমৎকার। অনেকদিন পর এমন চমৎকার একটা উপন্যাস টানা পড়লাম। অনুবাদ চমৎকার, ভাষার নানান ফর্ম বেশ ভালো লাগল। এত বড়ো কাজ এভাবে একটানে ধরে রাখা খুবই পরিশ্রমলব্ধ এক ব্যাপার।

৬.৭.১১

মন্তব্য, এখানে...
Share.

জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার জ্ঞানপুর গ্রামে, মামাবাড়িতে ১৯৬৩ সালে। সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে উজ্জীবিত বাজিতপুর এবং নাটকপাগল গ্রাম সরিষাপুরে জন্মগ্রহণের সুবাদে ছোটবেলাতেই সাংস্কৃতিক জীবনের হাতেখড়ি হয়। স্কুল-কলেজের ওয়াল ম্যাগাজিনে লেখালেখির মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়। তার ধারাবাহিকতা ছিল মেডিকেল কলেজেও। ২য় বর্ষে পড়াকালিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাহিত্য বিভাগ থেকে স্বরচিত গল্পে ৩য় স্থান অধিকার করেন। এটিই খুব সম্ভবত কোন সাহিত্য রচনার জন্য প্রথম স্বীকৃতি লাভ। প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ১৯৯৮ সালে মুক্তকন্ঠ-এ। প্রকাশিত গল্পের নাম ‘জলে ভাসে দ্রৌপদী। পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে ৫টি গল্পগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ৪টি গদ্য/প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং ১টি সংকলিত সাক্ষাৎকার। তাঁর প্রকাশিত বই: মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৫, জাগৃতি প্রকাশনী)। পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০০৬, মাওলা ব্রাদার্স)। স্বপ্নবাজি (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ)। কতিপয় নিম্নবর্গীয় গল্প (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রæয়ারি ২০১১, শুদ্ধস্বর)। উপন্যাসের বিনির্মাণ, উপন্যাসের জাদু (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১১, জোনাকী)। যখন তারা যুদ্ধে (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, জোনাকী)। গল্পের গল্প (গদ্য/প্রবন্ধ, একুশে বইমেলা ২০১৩, জোনাকী)। কথাশিল্পের জল-হাওয়া (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর)। ভালোবাসা সনে আলাদা সত্য রচিত হয় (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, জোনাকী)। দেশবাড়ি: শাহবাগ (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুদ্ধস্বর)। কথা’র কথা (সংকলিত সাক্ষাৎকার, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, আগামী)। জয়বাংলা ও অন্যান্য গল্প (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, জোনাকী)। কমলনামা (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বেঙ্গল)। হৃদমাজার (উপন্যাস, ডিসেম্বর ২০১৫, অনুপ্রাণন প্রকাশন), খুন বর্ণের ওম (উপন্যাস, ফেব্রæয়ারি ২০১৮, ঘোড়াউত্রা প্রকাশন)। সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘কথা’ প্রকাশিত সংখ্যা ৯টি (২০০৪-২০১৪)। ২০১১ সালে ‘কথা’ লিটল ম্যাগাজিন ‘শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিন প্রাঙ্গণ’ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি (মরণোত্তর)।

Leave A Reply