রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অষ্টনাগ ষোলচিতি কথাশিল্পী হাবিব আনিসুর রহমানের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। এতে বারোটি গল্প আছে – নেফারতিতি, বেহুলা লখিন্দরের গদ্য, প্রত্যাখ্যানের গল্প, দিন ও রাতের গদ্য, নিষাদ বালকের গল্প, জানালা, আমাদের নতিপোতা গ্রামের ইতিহাস, সংসার উপাখ্যান, মুগদাপাড়ার মেয়েটি, শাদা অন্ধকারের পদ্য, অজস্র গভীর রঙ পালকের ’পর আর শেষ গল্পটি হচ্ছে অষ্টনাগ ষোলচিতি।

‘অষ্টনাগ ষোলচিতি’কে প্রথমে মনে হতে পারে এ এমন এক বাড়ির গল্প যেখানে কথকের বাবা শেখ আফসার উদ্দীন চব্বিশ বছর আগে তার চাকরিতে রিটায়ার করে এই নারকেল সুপারি আম জাম গাছের মাঝে বি¯তৃৃত এক বাড়িতে সপরিবারে থাকেন। এখানে এক যন্ত্রণার বিষয়ও আছে, তাঁর বড়ো ছেলেটি মুক্তিযুদ্ধে মারা গেছে, কবরও আছে বাড়িটাতেই। বাবা তাই দেখেন, হয়ত কবরটির টানেই গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছেন। একধরনের আক্ষেপহীন জীবনযাপনই হয়ত করছেন। আছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের দাপট, মেজছেলেকে শাসনে রাখতে চায় এরা, গলায় জোর দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বারণ করে। দেশের শিল্পসাহিত্যকে নষ্ট হতে দিতে চায়। এরই মাঝে হঠাৎই পরিবারটির মনে হয় বাড়িতে এক সাপ ঢুকেছে, বাগানে ঢুকে পড়ে তা, সকলেই ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়। একসময় মেজপুত্রের ছেলে শুভকে সাপে কামড়ায়। কিরণ ওঝা তাকে মন্ত্রচিকিৎসায় সুস্থ করতে গিয়েও পারে না। কারণ এই স্থলে এমন এক বাজে ওঝা উপস্থিত যার কাছে সাপের পিঠের হাড় আছে, যার জন্য কিরণ ওঝার মন্ত্র কাজ করছে না। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতায় পূর্ণ বৃদ্ধ ওঝা সেই গিঁওটালি মানে বিষ না-নামার গিট্টুকে পরাস্ত করে বিষ নামায়, শুভ ভালো হয়ে যায়। সেই দুষ্ট ওঝাকে গ্রামের মানুষজন ঘেরাও দিয়ে ফেলে এবং ঠেলতে ঠেলতে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যার পিছনে আছে দেয়াল। লোকটি আর যাবে কোথায়, মানুষজন সম্মিলিতভাবে ওর মুখে থুঁথু দেয়। গল্পটি বলাও হযেছে সহজিয়া বাক্যশৈলীতে। তবে গল্পটির সবচেয়ে সমস্যা মনে করা যেতে পারে, একটা কুসংস্কারকে অর্থাৎ ওঝা দিয়ে বিষ নামানোকে একেবারে প্রতিষ্ঠিত সত্য ধরা হলো। কোনো পিছুটান নেই, ডাক্তার খুঁজবে দূরে থাক, কেউ এ ধরনের নামও নেয় না। অবশ্য কামড়ের জায়গাটায় কাপড়ের গিট্টু দেয়া, কালো রক্ত প্রত্যক্ষ করা, ব্লেড দিয়ে কেটে রক্ত বের করার কথা আছে। সাপের বিষ নামানোর বিষয়টা প্রতীক-সঙ্কেতের মাধ্যমে বা জাদুবাস্তবতার আদলে কিছু করা যেত হয়ত। মা মনসার নামে মন্ত্র, ওঝা এসব আমাদের গল্পসাহিত্যে হয়ত নতুন সংযোজন। মনসামঙ্গলকাব্য আর তারাশঙ্করের নাগিনী নামের অত্যন্ত চমৎকার উপন্যাস তো আমাদের আছেই। সাপের কামড়, ওঝা, বেহুলা-লখিন্দর সমাচার আরও বেশি মাত্রায় আছে ‘বেহুলা লখিন্দরের গদ্য’ নামের গল্পে। চাঁন সওদাগর, লখিন্দর, বেহুলা, সোনেকা, ওঝা, কালিনাগ-এর সাথে পরিচিত হয়ে মনে হতে পারে এটি মনসাপুঁথির সমকালীন কোনো ম্যাসেজ গল্পকার দিলেন। আসলে মঙ্গলকাব্যের এই চরিত্রেরা নামগুলিই শুধু বহন করে। এখানে আছে রাজনৈতিক লাম্পট্য, সমকালীন ক্যাডার রাজনীতির হিংস্র ধরন। লখিন্দর এখানে নষ্টভ্রষ্ট রাজনীতির বাহক। একমাস পূর্বেই বেহুলাকে বিয়ে করেও রাতে হরিপদ পালের যুবতী মেয়ে মাধবীলতা ওরফে মাধুপালকে অন্ধকারে রেপ করে। মাত্র চারদিন পর সনাতন পালের সাথে বিয়ে হওয়ার বিষয়টা পাকা হয়েছিল মেয়েটার। পায়ে দাঁত বসানোকে সাপের কামড় বলে চালিয়ে দিতে চাইল লখিন্দর। একসময় বেহুলার কানে এসব গেলে সে নিজেই লখিন্দরের পায়ের গিঁট খুলে দেয়। সে আপন-শক্তিতেই খাড়া হয়ে যায়। কিন্তু পাঠক জানতে পারবে লখিন্দরের ছোবল সইতে না পেরে মন্দিরের কাছে মাধবীলতারূপী একটা সাপ মরে আছে। এমনই প্রতীকী আবহে গল্পকার আমাদেরকে লাম্পট্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অষ্টনাগ ষোলচিতির সাপের কামড়, ওঝা, মন্ত্র ইত্যাদির অনেক অনুষঙ্গ প্রায় একই কায়দায় এ গল্পেও আছে।

‘নেফারতিতি’কে যৌনকাতরতা বা স্বার্থসিদ্ধির গল্প বলা যায়। কথক গল্পের শুরুতেই এটিকে তাঁর জীবনের সাথে জড়ানোর মতো তেমন ঘটনা নয় বলে জানিয়ে দিলেন। কিন্তু আমরা তো গল্পগ্রন্থটির প্রথম হৃষ্টপুষ্ট গল্পই পেলাম নেফারতিতি নামে। যাই হোক, কথক কেন এমন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন তা আমরা মানে পাঠকরা জানতে পারি গল্পটি পাঠে। নেফারতিতি কথকের ক্লাশমেট। একধরনের ফিল্মিক অ্যাটিচিউড সারাটি গল্পেই আছে। কথকের সাথে প্রেমের অভিনয় করে সে, নানা কাজ আদায় করে বিশেষ করে কথক অতিশয় মেধাবী ছাত্র হওয়ায় তার নোট আদায় করে, প্রেমের অভিনয় করে। কিন্তু নেফারতিতির বাবা যেমন অতিশয় দরিদ্র বলে প্রেমিকের সাথে নেফারতিতির বিয়ে দেয় না, তেমনি পরবর্তীতে দেখা যাবে নেফারতিতির বিয়ে হয়েছে বড়োলোক ব্যবসায়ীর সাথে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই ভদ্রলোক যৌনকাতরতাবর্জিত এক পুরুষ। তাই আবারও নেফারতিতি খুঁজে বার করে কথককে। এবার নোট নয়, গোটা দেহটা দরকার। কথক নৈতিকতার কাছে নিবেদিতপ্রাণ মানুষ – তাই পালিয়ে চলে আসে। তবে আমরা বুঝতে পারি না এমন একটা ঘটনা কী করে কথকের জন্য কোনো ঘটনাই হয় না। দ্বন্দ্বমুখর, নানামাত্রার কাতরতায় নিমজ্জিত আধুনিক পাঠকের হয়ত শরৎচন্দ্রীয় সততার আশ্রয় নেয়া তেমন ফলপ্রসূ কোনো কাজ মনে হয় না। তবে কথাসাহিত্যের জগৎ কিন্তু এখনও রবি ঠাকুর, শরৎচন্দ্র, মোহাম্মদ নজিবুর রহমান, আকবর হোসেনদের সাংসারিক-নৈতিক কথকতায় আটকে আছে বা রাখছে। যার জন্য এ গল্পপাঠে আমাদেরও হয়ত মনে হয়, কোথায় যেন কি পেলাম, আবার পেলাম না। নেফারতিতির সাথে কথক ইফতেখারের শুধু প্রেমই ছিল না, তা এমনই সরব ছিল যে নেফারতিতিতে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া শুধু নয়, আরও অনেক কিছুই ছিল। সেই নেফারতিতির সাথে প্রায় চারবছর পর পরস্ত্রী হিসাবে একলা ঘরেও দেখা হয় কথকের। নেফারতিতির স্বামী সৃজনে অক্ষম। কিন্তু কথক চরিত্রটি নৈতিকতায় অতই নিমগ্ন যে সে নায়িকার বাসায় বোকার মতো বসে থাকে। একপর্যায়ে নেফারতিতি তার উপর চড়াও হলে মিনিমাম কোনো জৈবিক ভাবান্তর হয় না ওর। পালিয়ে বাঁচে। যৌনচেতন কোনো পাঠক হয়ত বলতেও পারেন – ‘হায়, ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না। রবি ঠাকুর বা শরৎবাবু আর কতকাল আমাদের চৈতন্যকে শাসন করবেন। ধিক তোমার যৌবন।’

‘আমাদের নতিপোতা গ্রামের ইতিহাস’ নামের গল্পটি ধর্মান্তর, অভাব-অনটন, দুর্ভিক্ষ নিয়ে এক মানবিক অসহায়ত্ব নির্মাণ করেছে। ‘মুগদাপাড়ার মেয়েটি’ নামের গল্পে নারীর অসহায়তা, চাকুরীর নাম করে পুরুষদের যৌননিপীড়নকে একেবারে খোলাসা করে তুলে ধরলেন গল্পকার। ‘দিন ও রাতের গদ্য’ নামের গল্পে আছে চাঁদাবাজি আর মাস্তানির কথকতা। একধরনের দমচাপা বা¯তবযন্ত্রণার প্রতিফলন গল্পটিতে আছে। ‘শাদা অন্ধকারের পদ্য’ আশাভঙ্গের, একধরনের হাহাকারের গল্প। কিংবা নিজেকে আবারও চেনার গল্প। শোভার জীবনের স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা, স্বামীর সাথে বনিবনা না-হওয়া, গালিব নামক একজন শিল্পীর কাছে নিজের সত্তাকে আবিষ্কারের চেষ্টা, অবশেষে সেই চিত্রশিল্পীর খুন হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সবই যেন এলোমেলো হয়ে যায় ওর। গালিবের এক পিপাসুসত্তা আছে এখানে যে ছবি আঁকে; জীবননান্দ’র কবিতা শুধু নয় ‘নালন্দা’ নিয়ে লেখা এক অদ্ভুত নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে প্রাণ দেয়া তরুণ কবির কবিতাও তাকে অতিশয় বিমোহিত করে। ‘নিষাদ বালকের গল্প’ নামের গল্পটিতে এমন এক বালকের কথা বলা হয়, যে মেহেরপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজধানী শহরে আশ্রয় পায়। সে হাজী বোরহানউদ্দীন নামের এক বড়োলোকের গরুর লালন-পালন করে। বালকের উপর নিপীড়ন চলে। রবি ঠাকুরের ফটিকের মতো তার হৃদয়ও ক্ষতবিক্ষত হয়। ছেলেটাকে হাজী সাহেবের লেখক পুত্র পছন্দ করে। বাসা থেকে পালিয়ে যেতে বলে। একসময় গরুর আঘাতে তার পা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, পা ফুলে যায়। হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু হাজী সাহেব তাকে খুঁজে না পেয়ে থানা-পুলিশ ইত্যাদি করতে চান। লেখক পুত্রের উপদেশমূলক কথকতা প্রাপ্ত হয়ে গল্পটি শেষ হয়। সেই দিক থেকে জানালা অনেকটাই শিল্পোত্তীর্ণ গল্প। রাজনৈতিক মাস্তানি, তিনটি মেয়ের উপর মানসিক নির্যাতন, সাধারণ চাকুরে বাবার টেনশন ইত্যাদি পরিষ্কারভাবে আছে এতে। একপর্যায়ে এ বোঝা যায়, বাসার বড়ো মেয়েটির সাথে মাস্তানদের কারও মানসিক সম্পর্ক হয়ে গেছে। বাসাটির দক্ষিণদিকের জানালাটি চমৎকার প্রতীকী ব্যঞ্জনা বহন করে।

গল্পের আঙ্গিক, চরিত্রের বিন্যাস, সমকালীন বাস্তবতার শব্দচিত্র ইত্যাদি মিলিয়ে ‘অজস্র গভীর রঙ পালকের ’পর’ একটি টোটাল গল্প। এখানেও এক কবি চরিত্র আছে, তার সাথে ভালোত্ব-কবিত্ব মিলে-মিশে আছে। তবে এখানে প্রকৃতির প্রতি, আরও স্পষ্ট করে বললে পাখির প্রতি প্রীতি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে। কবি এই পাখিহীন কর্কশ প্রকৃতি থেকে বাঁচার জন্য বা নিজেকে দেখার কিংবা নির্মাণের জন্য অফিস থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি যায়। একটা মিথও হয়ত তার সহযাত্রী হয়। বুনোপাড়ায় সেই বটগাছ খুঁজে যেখানে পাখির কলতান ছিল, একজন সন্ন্যাসীর পাখিপ্রেম ছিল – কিন্তু কিছুই পায় না। বরং একালের কয়েকজন মাস্তান তার সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। লাথি মেরে কবিকে ফেলে রেখে যায়। গল্পটি হয়ত এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু এরপরও দেখা যাবে তাকে কয়েকজন ধরে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, একটা পরিপূর্ণ মীমাংসার তৃষ্ণা গল্পকারের আছে বোধ হয়। গল্পের নির্মিতি, পরিমিতিবোধ অনেকটাই পরিচ্ছন্ন। শবদনির্বাচনও যথার্থই। হয়ত এ গল্পটি দিয়েই গ্রন্থটি শুরু করা যেত।

গ্রন্থটি পাঠে কিছু সাধারণ প্রবণতা দ্বারা আচ্ছন্ন হই – পাঠকের সাথে গল্পের মানে সেই কাহিনীর একটা রিলেশন ওই গল্পের শিরোনাম থেকে। আমরা ধারণা করে নিই; অথবা কেউ কেউ বলতে পারেন, লেখক শেষ পর্যন্ত নামটি সার্থক করার এক মনোপীড়ন বোধ করেন। গল্পের শিরোনামও গল্পকার বিভিন্ন কথকতা, কাব্যময়তা, পুরাণাশ্রিত কথকতা, সাহিত্যের কাহিনী থেকে ধারণ করেন। সবচেয়ে বড়ো কথা শিরোনামের সাথে পাঠকের ইনভল্বমেন্ট হয়ত ভালোই হয়। নাম গল্পটির কথায় আসা যাক, গল্পটির একপর্যায়ে মা মনসার নামে মন্ত্র পড়ে কিরণ ওঝা। বেহুলা লখিন্দরের কথা, আছে গ্রীসিয় পুরাণের নেফারতিতি। তার গল্পে অনেক বিষয়ই ওঠে আসে – দ্বন্দ্বমুখর মানুষজন, প্রেম, অবিশ্বাস, যৌনকাতরতা যেমন আছে, তেমনি আছে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি। নাগরিক জীবন যেমন আছে, তেমনি আছে কথিত গ্রামীণ আবহমান বাংলা। তিনি কিছু বিশ্বাস বা ধারণা, মনোজাগতিক চেতনা দ্বারা তাঁর গল্প সাজান। পাঠককেও তার যথার্থ সহচর মনে করেন হয়ত। কিন্তু সমকালীন মানুষের হিংস্র-যন্দ্রণা, মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতম স্মৃতি, সাম্প্রদায়িক পীড়ন, শ্রেণীদ্বন্দ্বে নিমজ্জিত পাঠক হয়ত সেই ভাবে গল্পকারের সহযাত্রী হতে পারেন না। ডিশ এন্টেনা, ক্যাবল নেট-ওয়ার্ক, সেল ফোন, এনজিও’র লগ্নিপুঁজি, কর্পোরেট বাণিজ্য, যোগাযোগাগের বদলে যাওয়া ধরন ইত্যাদি মিলে গ্রাম আর শহর একাকার হয়ে যাচ্ছে। গল্পকার তাঁর গ্রামকে যতই কথিত আবহমান বাংলার স্থবির এক পশ্চাৎপদ এলাকা বলে ধারণা দেন, তা আর থাকছে কি? চিরন্তন আবেগের নামে গ্রামকে এক জায়গায় রাখাটা কতদূর বস্তুনিষ্ঠ তা ভেবে দেখা যেতে পারে।

তার গল্পসমূহে বড়োলোক চরিত্র যেমন আছে, তেমনি অবহেলিত, অবদমিত চরিত্রও কম নেই। তার সৃষ্ট ভালোমানুষি চরিত্রসমূহেকে রাজনীতিক পরিভাষায় বলা যায় উদার বুর্জোয়া মানবিক চরিত্র। এই ধরনের চরিত্রের মধ্যে আছে অধ্যাপক, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক। এরা অনেকটা যাত্রাদলের বিবেকের মতো কাজ করে। এরা আত্মত্যাগী, নিরহঙ্কারী, সীমিত আকারে প্রতিবাদী, শুভমূল্যবোধসম্পন্ন। একধরনের সংস্কারবাদী ক্রিয়াকলাপে তারা অতিশয় যত্নশীল। এরা সমকালীনও। টাকাকড়ি, নৈতিকতা, ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্তের নিজস্ব অহঙ্কার, ধর্মের সামাজিক প্রয়োগ ইত্যাদিতে তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে। গল্পকার এধরনের চরিত্র নিয়েই একধরনের সংস্কারমূলক কথকতা লিখে গেছেন। কখনও কখনও এরা এত গোছগাছসম্পন্ন যে মনে হতে পারে এরা অধিক চলিষ্ণু হলে হয়ত গল্পের রক্তমাংশ, রগে, উপরগে প্রবহমানতা আরও সজীব-চলমান হতো। তিনি গল্পের কাঠামো নির্মাণে, ভাষাশৈলীতে বা বক্তব্য প্রদানের কৌশলে খুব যে নতুনত্ব আনতে চান তা বলা যাচ্ছে না। পরিচিত শব্দ, অভ্যাস, কাহিনীর স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক রূপ, এমনকি গল্পের অবয়বও পরিচিত ধরনেই থাকে। সহজ কথাটি সহজভাবে বলার পরিমিতিবোধ তার লেখার বড়ো বৈশিষ্ঠ্য। পাঠকের সাথে সহজিয়া প্রীতির এক সম্পর্কই স্থাপিত হয়। পাঠক কখনও কখনও চরিত্রের নিমগ্নতায় বেদনার্তও হবেন। চরিত্রসমূহে আলোর ঝিলিক নমনীয়তায় পূর্ণ, চরিত্রের মনোজাগতিক জটিলতাও খুব বেশি নেই। আসলে তিনি দৃশ্যকল্প নির্মাণে একধরনের চলচ্চিত্রায়নে নিমগ্ন থাকেন। শব্দের মাধ্যমে অনবরত দৃশ্য বয়ান করে যান। মনে হয় তিনি একমনে পরিচালক আর ক্যামেরাম্যানের কাজটিই করে যাচ্ছেন। কিছুই বাদ যায় না, সবই বর্ণনা করতে থাকেন।

অষ্টনাগ ষোলচিতি
হাবিব আনিসুর রহমান
প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৫
প্রকাশনা : সূচীপত্র /ঢাকা
প্রচ্ছদ : মাসুদ কবির
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১২৮, মূল্য : ১২৫ টাকা

মন্তব্য, এখানে...
Share.

জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার জ্ঞানপুর গ্রামে, মামাবাড়িতে ১৯৬৩ সালে। সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে উজ্জীবিত বাজিতপুর এবং নাটকপাগল গ্রাম সরিষাপুরে জন্মগ্রহণের সুবাদে ছোটবেলাতেই সাংস্কৃতিক জীবনের হাতেখড়ি হয়। স্কুল-কলেজের ওয়াল ম্যাগাজিনে লেখালেখির মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার প্রাথমিক পর্যায় শুরু হয়। তার ধারাবাহিকতা ছিল মেডিকেল কলেজেও। ২য় বর্ষে পড়াকালিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সাহিত্য বিভাগ থেকে স্বরচিত গল্পে ৩য় স্থান অধিকার করেন। এটিই খুব সম্ভবত কোন সাহিত্য রচনার জন্য প্রথম স্বীকৃতি লাভ। প্রথম গল্প প্রকাশ হয় ১৯৯৮ সালে মুক্তকন্ঠ-এ। প্রকাশিত গল্পের নাম ‘জলে ভাসে দ্রৌপদী। পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে ৫টি গল্পগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ৪টি গদ্য/প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং ১টি সংকলিত সাক্ষাৎকার। তাঁর প্রকাশিত বই: মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৫, জাগৃতি প্রকাশনী)। পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০০৬, মাওলা ব্রাদার্স)। স্বপ্নবাজি (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ)। কতিপয় নিম্নবর্গীয় গল্প (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রæয়ারি ২০১১, শুদ্ধস্বর)। উপন্যাসের বিনির্মাণ, উপন্যাসের জাদু (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১১, জোনাকী)। যখন তারা যুদ্ধে (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, জোনাকী)। গল্পের গল্প (গদ্য/প্রবন্ধ, একুশে বইমেলা ২০১৩, জোনাকী)। কথাশিল্পের জল-হাওয়া (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর)। ভালোবাসা সনে আলাদা সত্য রচিত হয় (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, জোনাকী)। দেশবাড়ি: শাহবাগ (উপন্যাস, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, শুদ্ধস্বর)। কথা’র কথা (সংকলিত সাক্ষাৎকার, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, আগামী)। জয়বাংলা ও অন্যান্য গল্প (গল্পগ্রন্থ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, জোনাকী)। কমলনামা (গদ্য/প্রবন্ধ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বেঙ্গল)। হৃদমাজার (উপন্যাস, ডিসেম্বর ২০১৫, অনুপ্রাণন প্রকাশন), খুন বর্ণের ওম (উপন্যাস, ফেব্রæয়ারি ২০১৮, ঘোড়াউত্রা প্রকাশন)। সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘কথা’ প্রকাশিত সংখ্যা ৯টি (২০০৪-২০১৪)। ২০১১ সালে ‘কথা’ লিটল ম্যাগাজিন ‘শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিন প্রাঙ্গণ’ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক একুশে পদকে ভূষিত হন তিনি (মরণোত্তর)।

Leave A Reply