Friday, 20 May, 2022

জন্মবীজ : অপু শহীদ

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

এই ঘরের সাথে এক টুকরো বারান্দা আছে।। বারান্দা থেকে আকাশ দেখা যায়। আকাশ ঘন নীল। সব সময় নীল থাকে না। কখনও কালো হয়ে যায়। কখনও বা লাল। মাঝে মাঝে ঈষৎ নীলাভাস। কলা পাতা যত না সবুজ রঙ পাল্টায় তার চেয়ে বেশি রঙ পাল্টায় নীল আকাশ।

রাতের আকাশ নক্ষত্রখচিত। কাল মহাকাল অনন্ত যাত্রাপথ। হাজার হাজার নক্ষত্রের উল্লাস। শব্দহীন। গভীর। নির্জন চরাচর। বায়ুমণ্ডল বহমান। ক্লান্ত স্রোতহীন। জ্যোৎস্নার কত কত রূপ। মরা জ্যোৎস্না। তীব্র জ্যোৎস্না। ক্লান্ত জ্যোৎস্না। মায়াবি জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্নায় সাঁতার কেটে কেটে ভরা কাটাল মরা কাটাল পার করে একা চাঁদ। কত কত দিন ভেতরের কান্না গুমরে উঠে গান হয়ে যায়।

বারান্দায় কাঠের একটা মাচা করা। মাচার উপর থরে থরে সাজানো টব। পাশেই একটা আরামদায়ক চেয়ার। এই চেয়ারে বসেই এই গল্পের পাঠিকা ভাবছে। এবার কিছু শ্বেতকাঞ্চন আর রক্ত কাঞ্চনের চারা উঠাবে। কুর্চি ফুলের বীজ পড়ে আছে অনেক দিন। সেগুলোও ফুটিয়ে দিতে হবে। অপরাজিতা পাপড়িতে কিছুটা আকাশ ধারণ করে। আকাশের কষ্টের গাঢ় নীল নির্যাস থেকেই নীল অপরাজিতা। তবু ফুল নয়- শুধু ফুল নয় ফলজ বীজের অঙ্কুরউদগমনে জন্মদ মনে হয়।

যার কথা বলছি তার সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না। অনুমান করতে পারি মাত্র। সে আপনারাও করতে পারবেন। একটা বিষয়ে প্রথমত আপনাদের জানিয়ে রাখি সে নারীর ব্যক্তিত্বে গান্ধারীর আবেদন। চামড়ার নীচে কোনও চর্বি নাই। চোখে কাজল ছাড়া কেউ তাকে দেখেছে এরকম কাউকে চিনি না। চোখদুটো দেখলে পুরনো দিনের কড়ির কথা মনে পড়বেই। শাড়ির আচ্ছাদন ভেদ করে যতটা আভাস পাওয়া যাবে তাতে বাদামী রঙের সঙ্গে সামান্য দুঃখ মেশানো রয়েছে বলে মেনে নিতে হবে। সাদা মেশানো কালো চুলের পাশ দিয়ে দু কানে রূপালি রঙের আভরণ শোভা পায়। এছাড়া বাড়তি কোনও গহনায় আগ্রহ নাই। তবে সেমিনার বা বক্তৃতার সময় রুচির সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়ে নেয়। কেবলি মনে হবে দেবী হতে হতে মানবী হয়ে উঠেছে।

বারান্দার আকাশে কখনও কখনও জ্যোৎস্না গলে গলে পড়ে। কখনও বৃষ্টির অবিরাম ধারায় কান্না। সে কান্নায় বৃক্ষ লতা পাতা মাঠ ঘাট দালান ষ্টেশন রেলপথ নদী চা বাগান মসজিদ মন্দিরের সমস্ত দুঃখ ধুয়ে মুছে যায়। বারান্দায় কফি হাতে এ নারী তখন রোদনরূপসী। মাধবী কন্যা। মুছে যায় তার অধ্যাপক সত্তা। হারিয়ে যায় পিতৃদত্ত নাম। আকাশনীলা নাম ভেসে যায় মেঘভাঙা জলের ধারায়। শুধু নীলা নীলা বলে কে যেন ডাকতে থাকে। অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না কোন দিক থেকে ডাক আসে। মাঠ ঘাট নক্ষত্র মহাকাশ যখন জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় তখনও ডাক আসে। ডাক আসে অন্ধকার রাতে হু হু করা বাতাসের ভিতর থেকে।

বারান্দা থেকে আকাশ দেখা যায়। বারান্দা থেকে মাঠ দেখা যায়। বারান্দা থেকে চাঁদ দেখা যায়। বারান্দা থেকে মেঘ দেখা যায়। মনের মধ্যে আকাশ খেলা করে। মনের মধ্যে ফানুস উড়ে যায়। বৃষ্টিরা গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাঁটু গেড়ে বসে। জন্মাবধি অধিকার চেয়ে অনুরোধ জানায়। বৃষ্টি নীলাকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে। পৃথিবীতে এখন বৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নাই। শীত নাই। গ্রীস্ম নাই। রাত নাই। দিন নাই। বছর নাই। দেশ নাই। জাতি নাই। রাষ্ট্র নাই। ধর্ম নাই। আলো নাই। অন্ধকার নাই। কেবল বোধ আছে। সেই বোধ বৃষ্টির সাথে খেলা করে। সেই বোধ একশ বছর এগিয়ে যায়। একশ বছর পিছিয়ে যায়। সেখানে আজকের কেউ নেই। আজকের আলো বাতাস উল্লাস হাসি দুঃখ বেদনা সকলি অতীত কালের স্মৃতি। যেমন করে শতবর্ষ আগের কোনও এক জন্মবীজ আজকের বর্তমান।

নীলা বয়স হারিয়ে ফেলছে। বৃষ্টির ঝাপটায় দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। বয়স কমে গিয়ে নাসিং হোমে ফিরে যায়। একবার নয় তিন তিনবার। শেষবার কী এক জটিলতায় জ্ঞান ফিরেছিল অনেক দেরিতে। তিনজনই এখন দেশের বাইরে থাকে। নিজ দেহ রক্ষা এবং বীজ উৎপাদনে ব্যস্ত গর্ভজাত বীজানুরা।

নীলা বীজ নষ্ট হতে দেয় না। সমস্ত বীজ থেকে চারা উঠাতে চেষ্টা করে। বারান্দা তার বীজতলা। একেক মৌসুমে একেক ফলের চারা তার নেশা ধরায়। বিশেষ করে যেসব ফলের গাছ অনেক বড় হয়। যাকে বলা যায় বৃক্ষ। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও খুব যতœ নিয়ে মাটি তৈরি করে। নিজেই জৈবসার বানিয়ে নেয়।

নীলা এই গল্পগুলো বলতে ভালবাসে। বলতে বলতে নীলার চা ঠান্ডা হয়ে যায়। বন্ধুরা মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে। শুনতে শুনতে বন্ধুদের চা ঠান্ডা হয়ে যায়। নীলা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে যায়। বন্ধুরা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে যায়। পাঠক পড়তে পড়তে গ্লানি বোধ করছেন। নীলা নিজেও বলতে বলতে একজন পাঠক হয়ে উঠছে। নীলা আসলে শীলার গল্প বলছে। শীলা যিনি অনেক কথা বলে কিন্তু সবটা বলে না। শীলা আসলে সবটা জানে না। কিছুটা জানে দেবলীনা। দেবলীনা বেশিদিন দেবলীনা থাকতে পারে না। শাহনীলা হয়ে যায়। শাহনীলা শেষ পর্যন্ত শাহলীনা থাকে না। নীলা হয়ে যায়। শুধু নীলা। আর লীনা আর নীলা আলাদা থাকে না। কিছুটা কিছুটা এরা সকলেই জানে। বোধ দিয়ে।

পাঠক ঠিকই ধরে ফেলেছেন। কিছুতেই একে গল্প হতে দেয়া যাবে না। গল্পে শেষ পর্যন্ত একটা কেমন আশাবাদ থেকে যায়। এবার একে চূড়ান্ত নৈরাশ্যবাদে ঠেসে দিব। সবকিছু যখন ধ্বংসের দিকে ধাবমান তখন একটা সামান্য গল্পকে সার্থক হতে দিতে পারি না। পাঠক নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে উঠবেন। যখন দেখছেন জীবনের আশা আকাঙ্খা আনন্দ বেদনা বিপন্নতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। গল্প জীবন হয়ে উঠছে। জীবন হয়ে উঠছে গল্প। জীবন এখানে অস্থির অনুভব নিয়ে নিজ কেন্দ্রে ভর দিয়ে বৃত্তাকার ঘুরে যাচ্ছে। সেই অস্থির অনুভব একটা ভাষা নির্মাণ করে। সেই না-ভাষা দিয়ে অনুভবের দৃশ্যের অনুবাদ হয় না। শব্দ যেখানে শব্দবীজ ফেটে বেরিয়ে আসে না। সেখানে শব্দের পর শব্দ সাজালেই একটা গল্প তৈরি হয় না। শূন্যতাকে অস্তিত্ব দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তাই এ একটা না-গল্প হয়ে উঠার চেষ্টা করবে। বীজ থেকে জন্মাবে কেবল। বাকীটা পাঠকের উপর নির্ভর করবে।

শূন্যবীজ।

যা শরীরময় হয়ে উঠে না। সময়ের সংকেত ধারণ করে না। দূর অতীতের তরঙ্গ ধ্বনি আগামিতে বহন করে না। কেবল শূন্যসময় নির্দেশ করে। সেই শূন্যবীজের জন্য পড়ে থাকে অর্বাচীন মায়া।

জন্মবীজ।

অনিয়ন্ত্রিত শক্তি। সময়ের ওপার থেকে ধেয়ে এসে চলে যায় সময়ের অপর পারে। শুধু বীজ নয়। নিষিক্ত বীজ। যে বীজে ভ্রুণ আসে। প্রাণ আসে। নিজেকে ভেঙে নিজে বেরিয়ে আসে। বস্তু শৃঙ্খল ভেঙে নক্ষত্র ঘড়ির অংশ করে তোলে নিজেকে। রক্ত থেকে রক্ত। বীজ থেকে বীজ। ভ্রুণ থেকে কুঁড়ি। কুঁড়ি থেকে শরীর। শরীর থেকে সুগন্ধ। ধ্বনি থেকে গান।

নীলা বীজতলা থেকে তুলে নেয় শিশু গাছ। এদের পুতে আসবে দূরে কোথাও। বারান্দা থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া যায়। তা করবে না জননী সত্তা। দিনের পর দিন মাটি সিক্ত করে। রোদের তাপদাহে ছায়া দিয়ে। ভোরের আলোয় আর সন্ধ্যায় জলের আর পাখির বুকের ভালবাসা মিশিয়ে বীজ থেকে বের করে এনেছে প্রাণ সত্তা। এ এখন যে কোনও মাটিতে শেকড় বসাতে পারে। এ চলে যাক মহাকাশের কুণ্ডুলিতে।

বৃক্ষ এবার যেখানে খুশি সেখানে যা। বৃক্ষধর্ম পালন কর। আমি কেবল বীজ সংগ্রহ করে নেব। বীজ থেকে ফুটিয়ে দেব গাছের বাচ্চা। প্রতি সপ্তাহে বীজ ফোটাব। হাজার হাজার বীজ ফুটবে। বীজ থেকে বেরিয়ে চিৎকার করবে। দাঁত গজাবে। নখ গজাবে। আমি আর সে সবের জন্য অপেক্ষা করব না। তোদের রেখে আসব রাস্তার ধারে। পোড়োজমিতে। কবরখানায়। শ্মশান ঘাটে। রাশি রাশি বৃক্ষ বৃষ্টিতে ভেসে যাক। দাবানলে পুড়ে যাক। ঝড়ে উড়ে যাক। বন্যায় ডুবে যাক। নীলা এ সবের দায় নেবে না। নীলা নির্ভার হতে চায়। একা হতে চায়। আদিম শূন্যগর্ভে বীজানুভাণ্ডর তুলে দিতে চায়। সে বীজ আলো পান করে মস্তিষ্ক ধারণ করুক। হাজার মাইল উড়ে যাক পাখি হয়ে। ডালপালা ছড়িয়ে দিক। ফুল দিক। ফল দিক। সুগন্ধ ছড়িয়ে দিক দিকে দিকে। অথবা চাপা পড়ে যাক শিশু থাকতেই। করাত কলে চালান হয়ে যাক। সেসব চেতনার দিকে যাবে না নীলা।

সকল বর্ণমালা ফুরিয়ে গেছে তার। সে আর কারও স্ত্রী কন্যা ভগ্নী নয়। স্মৃতিগুলো নিস্তেজ ঠাণ্ডা বরফের নীচে চাপা পড়ে থাক। একটার পর একটা বীজ ধারণ করে যাবে সে। ছায়া দেবে। তাপ দেবে। আলো দেবে। জল দেবে। বীজ থেকে ভ্রুণ বেরিয়ে আসুক। একেকটা বীজের ভিতর ভাষা লুকিয়ে থাকে। বীজ ফেটে গিয়ে ভাষা অবমুক্ত হোক। ফেলে দিয়ে আসবে তাদের নিরাপদ দূরত্বে। যাতে বৃষ্টিতে হেঁটে এসে বারান্দার বাইরে দাঁড়িয়ে স্মৃতিরমেদ বহন করে না আনে। ভেসে যাক থরো থরো কম্পিত সাতটি অমরাবতী। চকিত চুম্বনে উদাস ঠোঁটে নেমে আসুক গায়ত্রী সন্ধ্যা।

বৃক্ষ যদি পারে তো সবল হয়ে উঠুক। আকাশের দিকে মেলে দিক ডানা। ফুলে ফলে সাজিয়ে তুলুক ভরা সংসার। নতুবা তলিয়ে যাক জোয়ারের জলে। গবাদির খাদ্য হোক তৃণকাল শৈশবে। সেসবে নাই সামান্য গরজ আর। বীজের পরমানুর ভিতর হৃদয়ের ডাক শুনতে পায় সে। ভয়ানক হয়ে উঠে মৃতের আর্তনাদ। মধ্যবিন্দুতে যেন এক মহকর্ষণের টান। সেই টান অনুভবে নিলে ঘটে যায় নৃতাত্ত্বিক গ্রন্থিক্ষরণ। শূন্যগর্ভে ভেসে ওঠে বীজের ভ্রুণ। জন্মের এত কাছাকাছি এসে আবার মহাকালের কাছে ফিরে যাওয়ার আর্তনাদ।

মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু।

জন্ম জন্ম জন্ম

জন্ম মৃত্যু জন্ম মৃত্যু

জন্ম জন্ম মৃত্যু মৃত্যু

জন্ম আর মৃত্যু

মৃত্যু আর জন্ম একাকার। আর তাই জন্মের আগে। অথবা মৃত্যুর আগে। একবার জন্মের আশ্রয় চায় জন্মবীজ। নীলা শুধু তাই চায়। শুধু জন্ম দিতে চায়। আর কোনও দায় নেই তার।

শুধু বীজের মৃত্যুর অথবা জন্মের আগে নিষিক্ত করবার দায়।

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
অপু শহীদ

অপু শহীদ

নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ও বর্তমান বসবাস ঢাকায়। প্রকাশিত বই: সার্বজনীন নীরবতা চুক্তি (অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৭), চৈত্র বলে মেঘে যাবো, ঈশ্বর পাঠ।