সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আয়োজনটা ভিন্ন। সমস্ত আলো উবে গেছে। হাঁটতে গিয়ে পা ঠেকে যাচ্ছে হয় উপরে নয় ডেবে যাচ্ছে নিচের দিকে। কিছুতেই আর চলার সমতা এবং তাল রক্ষা করা যাচ্ছে না। এবড়োথেবড়ো রাস্তা আর অন্ধকারের মিশ্রণ চলার স্বাচ্ছন্দ্যকে ঘোলা করে ফেলেছে। রেললাইনের পিঠের দাড়া আকাশের আলোর রিফলেকশনে ছায়াপথ হয়ে সামনের দিকে এগুচ্ছে। গোটা অন্ধকারকে বিভক্ত করেছে ছায়াপথটি। একপাশ দিয়ে যুবকটি দ্রæত হাঁটছে। এখনই ওকে পৌঁছতে হবে। অন্ধকারের ভেতরই শেষ করতে হবে কাজ। শুধু অন্ধকার। কোন প্রাণী নেই। সে যতই বুঝতে পারে অন্ধকার ছাড়া তার সামনে আর কিছুই নেই ততই সাহসী হয়ে ওঠে যুবক। সে এভাবে রাতের অন্ধকারে নিজেকে ব্যপৃত করে সাহসী ও দুর্দান্ত হয়ে উঠে। গায়ে চাদর মুখ মাফলার দিয়ে ঢাকা। হঠাৎ পলকে চিনে ফেলার কোনো জো নেই। আলোচনা ও ব্যবহারিক বিদ্যা শেষে ফিরতে হবে তাকে। রাতে চলার জন্য যে অস্ত্রটা তাকে সাহস যোগায় সেটা সে এমনভাবে গোপন করে রেখেছে চট করে কেউ বুঝতে পারবে না। রাতে যে আলোচনা ও অস্ত্র মহড়া দেয় যুবক তার সাথের কেউ বলতে পারে না। মাটির রাস্তার মুখোমুখি হয় যুবক। মাটির রাস্তাটিকে বিভক্ত করে রেললাইন সোজা চলে যায় সামনে। যুবক ঢুকে পড়ে গ্রামে। গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে এক ঘরের কাছে যেতেই সে শুনতে পায় কান্নার শব্দ, ফুঁপানি, চাপা কণ্ঠ। অনেক দূরে—–অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে যেন। সাপের ছোবলের শব্দ পাওয়া যায়। ধনুকের মতো পিঠ বাঁকা করে সাপ বারবার ছোবল মারে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে জলের উপর রাজহংসের ডানা ঝাঁপটানো। শব্দগুলো অনেক দূর থেকে ভেসে আসতে আসতে যুবকের কাছে এসে নীরবতায় মিলেমিশে যায়। একটু ভাল লাগে। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারে না, চলতে হয় তাকে। আবার অন্ধকারে মিশে যায়। গ্রামের সরু আঁকাবাঁকা রাস্তার উপর দুইপাশে বাঁশঝাড় আর গাছ-গাছালির ফাঁক-ফোকরে ছায়াপথের আলো অন্ধকারকে ফোঁটা করে একেবারে মাটিতে এসে বিঁধে। আলোর দড়িগুলো গোটা আসমানটাকে ধরে রেখেছে নৌকার পালকে আটকে রাখার দড়ির মতো। মনে হয় দড়িগুলো ছিঁড়লেই আসমানটা উড়ে যাবে সুতা ছেঁড়া ঘুড্ডির মতো। হঠাৎ যুবক দাঁড়িয়ে যায়। একটা কিছু পরখ করার চেষ্টা করে। হাঁটু গেড়ে এ্যাম্বুস নেয়। সাপের চোখের আলোর তীক্ষèতায় অন্ধকার কাটে করাতের মতো। ছায়াপথের আলোর রশিগুলো কাটা-কাটা হয়ে দুলছে নড়ছে। কেউ আসছে। তড়িৎ পথের দখল ছেড়ে দেয় সে। কাঁচারে কালো এবং অন্ধকারের মতোই সম্ভবত গাবগাছের আড়ালে অন্ধকার এবং কালোতে মিশে যায়। পায়ের কাছেই সাদা বেড়াল সন্তর্পণে ঘুর-ঘুর করে। পা তুলে ধমক দিলে দৌড়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। লেজকে নাড়ায় দলপতি বানরের মতো। যুবক পথে উঠে হাঁটতে থাকে। ছায়াপথ এবং নক্ষত্ররাজির আলোয় টাকপড়া মেঠো পথ ক্রমধারায় দৃশ্যমান হয় যুবকের সামনে। দ্রুত হাঁটতে থাকে সে। অলস নির্বিকার নীরবে রাস্তা পার হয় ক্ষুধামগ্ন রাতের শিয়াল। পথ চলায় ঈষৎ ছেদ পড়ে। সূর্য-গিলা মেঘের ছায়ার মতো দৃষ্টিটা শিয়ালের উপর পড়তেই বাঁকা করে মর্দী শিয়ালটি ভ্রুক্ষেপহীন তাকায়। নীরবে শিয়ালে যুবকে নিরাপদ চোখাচোখি হয়। অতঃপর অলসভাবে ধীর ছন্দে নিচের দিকে অন্ধকারে মিশে যায়। যুবকও পূর্ব ছন্দে হাঁটতে থাকে টাকপড়া মেঠো পথ ধরে।

হাঁটাটা থিতু হওয়ার আগেই দুইপাশের গাছ-গাছালি ঝোঁপঝাড় বাঁশ জিংলা সব সমেত এসে মাথার উপর ভেঙে পড়ে যেন। দৃষ্টিটা আলোর গতির মতো উপরের দিকে চলে যায়। শব্দের গতির সাথে দৃষ্টির গতি চালাচালি হয় দ্রুত। মনের অজান্তেই পিঠ থেকে কাঁটাটা চলে আসে হাতে। ডানহাতটা ট্রিগারের আঙিনায় বাঁ হাতটা ঈষৎ উপরে ব্যারেলটায় শক্ত মুঠোতে স্থির হয়। নিজের দৃষ্টির সাথে নলের দৃষ্টি উপরের দিকে দ্রুত চলাচল করে। সমস্ত গাছ-গাছালি ডালপালা মাথা ছুঁই ছুঁই উপর নিচ উঠা-নামার দ্রুততায় ভর বর্ষার হাওরের মৃদু ঢেউয়ে পরিণত হয়। শালার ল্যাঞ্জা পরকীয়া করো, মাথায় মাল উঠছে? এক্কেবারে ফুন্দেদ্যা কাডা রাইফেলের বুতা নল – সবডা ঢুকাইয়া দেওন দরকার। আমার লগে বিটলামি!

কাটাটা পিঠে প্রতিস্থাপনের পর শরীর মন কাদামাটির মতো ঠিকঠাক করে কোমড়ে গোঁজা বেয়নেট সদৃশ ছুরাটা একবার পরখ করে নেয়। সামনের সরু সংকীর্ণ জলহীন প্রায় মাঠে পরিণত হওয়া খালটা পার হলেই একটা ছোট জঙ্গলের মতো ঝোঁপঝাড়। দুইপাশে আন্নাকচু লতাপাতা ছুতমান্নি লজ্জাবতীর গাছ-গাছরায় আবৃত জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সাপের পিঠের মতো সরু ঠিক রাস্তা নয় পথ দিয়ে কতটুকু গেলেই একটি বড় মজা পুকুর। পুকুরের চতুর্পাশে বেতজোড়-এর ভিতর দিয়ে সেই পূর্বের মতো সংকীর্ণ পথ দিয়ে বেরুতে গেলেই দুই পাশে উপর নিচে সাপের জিহ্বার মতো বেতছায়ার ছোবল মারার ভয়। অতি সন্তর্পণে পুকুরপাড়ে উঠেই ইঁদুর আর সাপের গর্তটর্ত পার হয়ে কোনমতে লিলার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় সে। এখন একটু এক চিলতে ময়দান, ভেতর বাড়ির উঠানের মতো। মাথার উপর এক লহমা কালচে নীল আকাশ। তারাভরা নয়, খালিও নয়, একটুখানি আলোকিত চিকন চিরি ঘাস দূর্বায় ঠিক ভর্তি নয়। যুবকের শরীরের কিছু কিছু অংশের লোমের হালকা-পাতলা উপস্থিতির মত। গা-গতর শিশিরে ভিজে লেপ্টে আছে, ঠিক ফোঁটা ফোঁটা নয়- এ স-ব কিছুকে মাড়িয়ে এক পা দু’পা করে লিলার ঘরের সামনে হাতের তালু-করতলের মতো মাটির পিরাটায় এসে সে দাঁড়ায়। দরজাটা প্লেনসীট টিনেরই, একটু ছুঁলেই দূর থেকে ভেসে আসা মেঘে মেঘে ঘর্ষণের শব্দের ঢেউ উঠবে হয়তো। ঘরের চতুর্পাশ গমের আঁটি দিয়ে ঠাস বুননে বেড়া দেয়া। তবু ভেতরটা ঠিক মানুষের পেটের ভেতরের মতো অন্ধকার যে নয় বুঝা যায়। খড় খুটোর চাল এবং বেড়ার মিলন মোহনার ফাঁক-ফোকর দিয়ে আন্দাজ করা যায় ভেতরটা আলো আবছায়া। লম্প অথবা হরিকেন-শলতেটা নিচে নামিয়ে চৌকি অথবা ড্রামড্রোমের পিছনে নিশ্চয় রাখা আছে। যুবক প্লেনসীটের দরজার পেটে ডান হাতের তর্জনীর কনুই দিয়ে দুইটা টোকা দেয়। শব্দটা ঘরের ভেতর হয়ে নীরবতাকে হাতুড়িপেটা করে সমস্ত চরাচরে লীন হলে যুবক তখন আর একটা টোকা মারে একটু জোরে। লিলা উঠে আসার শব্দ পাওয়া যায় কি না যায় বুঝা যায় না কিন্তু দরোজাটা খুলে যায়। যুবক ভিতরে ঢুকে পড়ে। লিলা ত্রস্ত হাতে দরোজা বন্ধ করে। বিষু ভাই! বলে বিপুল আবেগে সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়া বিষুর ম ম সৌরভের গাহনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেমন আছেন, কেমন ছিলেন, মেলা দিন পড়ে এলেন, শরীর ভাল আছেতো, এতোদিন আসেননি কেন, রাজনীতির অবস্থা কি ইত্যাদি আরো কতোকিছু বলা-জানা-জিজ্ঞাসার ঘূর্ণিস্রেতের ভেতর পড়ে যায় সে। সবকিছুই ভাল, কোন অসুবিধা নেই, আজকে তোমাকে সময় দিবো না, আরেকদিন সময় করে সময় দেবো, আইচ্ছা এ্যালাচদের বাড়িটা ঠিক ধরতে পারতাছি না, ঐখানে আমাদের দলের লোকজন আসবে। গুরুত্বপূর্ণ সভা আছে। তুমি আমারে ওদের বাড়িটাতে একটু নিয়া যাও।

কী আন্ধাইর রাইত, ক্যামনে যে চলেন! আইচ্ছা আপনার কি কুনো ডর-ভয় নাই?

জীব-জন্তুর ডরের কথা কইতাছ? আরে বুকা, জীব জন্তুরতো কুনো ডর নাই। ডরতো মাইনষের। মাইনষের মতো খারাপ এবং হিংস্র কুনো প্রাণি আছে নাকি- ইতানরেই ডরাই না, রাষ্ট্রডারে চ্যালেঞ্জ কইরা চলি সর্বদা। আমাদের আবার ডর কী? আমরা সংখ্যায় বেশি না? বৌত বেশি।

তবুও তো…

তবুও তো কি? আমিতো যুদ্ধা। একাত্তুরে যুদ্ধ করেছি। আমার যুদ্ধ এখনো শেষ অয় নাই, যুদ্ধ যতো দিন শেষ না হইবো ততদিন যুদ্ধ করেই যাবো। চল চল জলদি। লিলাদের বাড়ির পেছনে ছিলুমখালি। ছিলুমখালির দুইপাশে দুই গাঁও। গাঁওয়ের নাম বালিগাঁও আর এ্যালাচদের গাঁওয়ের নাম বীর কাশিমনগর। লিলাদের বাড়ির পিছনদিক মানে তাদের বাড়ির আইছা দিয়ে বেরিয়ে ছিলুমখালির বুক পেট অথবা কোমড় মাড়িয়ে একটু এগুলেই বীর কাশিমনগর এ্যালচদের গ্রাম। ছিলুমখালির ইথান এবং পৈথানে কি আছে এবং কোথায় শেষ হয়েছে যুবক বিষুর এই মুহূর্তে মনে পড়ে না। তবে বিষুর বিচরণের বাইরে যে নয় এটা সে বুঝতে পারে। কত বড় এই ছিলুমখালি? মনে অয় কেনো এককালে এই ছিলুমখলিই নদীর মতো বিল, বিলের মতো নদী ছিল। এই নদী বা বিলের বুক বেয়ে নিশ্চয় কোনো নতুন বর-কনে ছৈয়া নৌকায় বয়ে গেছে তদের নিজ নিজ বাড়ি। নদীজল বা বিলজলে নিশ্চয় মিলেমিশে একাকার হয়েছে নতুন কনের চোখের জল। বাড়ির বউ হাটবারে নিশ্চয় বিল-কাদা-জলে পা ডুবিয়ে অপেক্ষা করেছে তার সুখের বর কখন আসবে চাল ডাল তেল নুন তরি-তরকারি মাছ গোস্ত সাথে নিয়ে। হয়তো কালের গর্বে মানুষের ছোঁয়ায় বসবাসের প্রাবল্যে, ময়লা আবর্জনার অত্যাচারে একদিন এই কলরব, সজল মৃদু হাওয়া বয়ে চলা  স্রোতেলো খাল বিল নদী মানুষের ভিতর বন্দি হয়ে পড়ে। জল হারিয়ে ফেলে তার স্রোতেলো, কৌমবিল নদী মানুষের ভিতর বন্দি হয়ে পড়ে। জল হারিয়ে ফেলে তার স্রোতেলো, কৌমযৌনাবেদন। ক্রমে শুকিয়ে যায় সে। আবদ্ধ হয়ে পড়ে জলবায়ু। রূপান্তরিত হয় বর্তমান ছিলুমখালিতে।

হঠাৎ ককিয়ে উঠে। বেতকাটা কাপড়-চোপড় খামছে ধরে। কতক্ষণে যে ওরা ছিলুমখালি পার হয়ে বেতজোড়ের ভিতর দিয়ে বীর কাশিমনগর ঢুকে পড়ে খেয়ালই করেনি। কেনোমতে বেতকাটা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় এ্যালচদের বাড়ি। গোটা বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে থাকে। অন্ধকারেই চিনে নেয় লিলা। বছরখানেক আগে আরেকবার বিষু এসেছিল। একটা গুরুত্বপূর্ণ সভা ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা উপস্থিত ছিল। ঐ সভায় পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্ব পায় সে। এরপর আর আসা অয় নাই। ঠিক আছে লিলা তুমি চলে যাও। নিজেকে প্রস্তুত করো। যে বইগুলো দিছিলাম নিশ্চয় পড়েছ। পড়ে পড়ে চিন্তার জগতটা প্রসারিত করো। দেখা হবে, আবার দেখা হবে, বিদায়। লিলা চলে গেলে বাইর বাড়ির দেউরি-টেউরি পার হয়ে ভিতরে ঢুকে বিষু। অন্ধকার, শুধুই অন্ধকার। একটা ঘরের সামনে যেতেই নিজের ঘর নিজের বাড়ি বলে বিভ্রম লাগে। ঐ ঘরে কি আমার মা শুয়ে আছে? মা….!

বাবা আইছস তুই, বাবারে আমি যে তর জন্যে মরতে পারি না, ঠিক মতো খাইতে পারি না, কত কষ্টরে বাবা! তুইনি মইরে গেছছ হেই কষ্ট, ক্যামনে বাছছ হেই কষ্ট, আমার কষ্টের কিনারা নাই।

মা আমি আইছি, আর যাব না মা। তোমার আর কষ্ট হবে না।

আয় বাবা আমার বুকে আয়। যেভাবে তরে আমি পেটে রাখছিলাম হেইভাবে তরে আমি বুকে রাহুম, আর যাবি না তো বাবা! তরে ছাড়া আমি ক্যামনে বাঁচি! দেশতো স্বাধীন হইলো হেই কবে, এহন আর কি যুদ্ধ করচ বাবা!

তুমি বুঝবা না মা, অহনের যুদ্ধই সবার থেকে বড় যুদ্ধ। কবে শেষ হবে জানি না মা। বাঁচবো কি না, মা, তাও জানি না। মা তুমি মইরা যাও।

না বাবা তরে আর আমি যাইতে দিবো না। আমি মইরা গেলে তুই মইরা গেলে তরে কেডা মনে রাখবো! মাইনষে কয় বাতুরমার ছাওয়ালডা ডাকাইত অয়া গেছে। আডিফারার লুকজন কওয়া-কওই করে তুই বুলে মানুষ মারছ, লুটফাট করছ। কি কমুরে বাবা আমিতো কিছু বুঝি না, খালি তর লাগি মনুরাডা ফাল ফারে আর কষ্টে ডুইব্যা যাই। মনে হয় এরা অগলতে মিইল্যা আমারে হাত পা বাইন্ধ্যা ফানিতে ফালাইয়া দিছে, আমি মরিও না বাঁচিও না, ফানির বুরুঙ্গা হয়া মরা-বাঁচার মাইঝে জুইল্যা তাহি।

বিষুর দুই করতল প্রসারিত করে মার মুখটা আলতো করে চোখের সামনে তুলে ধরে! মায়ের মুখ শেষ রাতের চাঁদ হয়ে দ্রুত দৌড়াতে থাকে। অপরদিক থেকে একটা অজগর মেঘ এসে একটু একটু করে গিলতে থাকে এবং এক সময় মায়ের মুখটা অজগরের পেটে হারিয়ে যায়। অতঃপর অজগরটা মেঘ হয়ে আকাশের শূন্যতায় কোথায় যে উড়ে যায়! বিষুর দৃষ্টি হামলে পড়ে সারা আকাশময়। খুঁজে ফেরে মায়ের মুখ। দুই করতলে নিজের মুখ খাবলে ধরে হাঁটু গেড়ে লুটিয়ে পড়ে বিষু। একটা দশটনি ট্রাকের নিচে পড়ে যায় সে। বিষুদা … ডাক শুনে বিপণ্ণ বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত বিষুদা পশ্চিমাঞ্চলের কমান্ডার কমরেড বিষু নিজেকে ট্রাকের তলা থেকে টেনে বের করে। উঠে দাঁড়ায়। কাটাটা পিঠে ঠিকঠাক করে কোমড়ে বেয়নেটসম খাপসহ ধারালো ছুরিটার মাথা-মুণ্ড দেখে নেয় আরেকবার। চতুর্দিকে দৃষ্টির নলটা তাক করে একের পর এক ট্রিগার টিপতে থাকে। নিশানার জমিনে কোনো প্রাণির গোচর হয় না। একটু একটু করে আরো ভিতরে ঢুকে। একেবারে বাড়ির পিছনে চলে যায়। এবার সে নিস্তব্ধতার হেরাগুহা থেকে বেরিয়ে দুই দাঁতপাটি এক করে জিহ্বাটিকে ড্রেন বানিয়ে সাপের হিস্-এর মতো শিস্ তোলে। শিস্ শব্দটা শতশত রাবার বলের মতো ড্রপ খেতে থাকে দৃষ্টি নন্দন ছন্দে- বেরিয়ে আসে কোনো এক আদিম গুহা থেকে কোনো একজন, প্রাণের সূর্যোদয় ঘটে। বিষুদা আমি ভুলু। আমার সাথে আসেন। বিষু অতিশয় আতিশষ্যে নিজেকে প্রতিস্থাপন করে ভুলুর মাঝে। বিষু হাঁটে।

কিছু শুনেছেন নাকি বিষুদা?

না তো, কি?

আসেন…. শুনবেন। আমাদের এই বিভাগের প্রধান ভাইও উপস্থিত আছেন আজকের সভায়।

তাই নাকি? কি হইছে, কোনো কিছু ঘটছে নাকি?

অস্থির হওয়ার কিছু নাই। শুনবেনইতো।

দূর মিয়া কও দেহি। বিষুর ভেতরটা মোচড় খায়। ভুলুর পেটের ভিতর অন্ধকারে আদম ও বিবি হাওয়া একযোগে কুচকাওয়াজ করে। পার্টি নাকি ভেঙ্গে গেছে। শেরালি, কমরেড শেরালি তার বিভাগ এবং দলবল নিয়া আলাদা দল ঘোষণা করছে। বিষু একলাফে খাদে পড়ে যায়, ডুবতে থাকে-

কও কি? তাইলে এহন কি অইবো?

ঝোঁপঝাড় জঙ্গল-টঙ্গল পার হয়ে ছাল উঠা ভাঙ্গাচোরা প্রাচীর ঘেরা এক আখড়ার প্রাগৈতিহাসিক গেইট গলে ভিতরে ঢুকে বিষু প্রত্যক্ষ করে আখড়ার নাট মণ্ডপের ময়দানে দিশারি হারিকেনের আলো কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে চতুর্পাশে গোল হয়ে কিছু মানুষ তাদের মেরুদণ্ড ধুতরার বিষ নিয়ে নুব্জ জবুতবু বসে আছে। সল্তের আলো কখনো দপদপ কখনো স্থিত হয়ে মৃদু আবছা দুর্বল আলোটা চতুর্দিকে অন্ধকারকে দু’হাতে ঠেলে সরাতে পারে না। মানুষগুলোর চোখের ভিতর আলো ঢুকে দূর থেকে চার্জ শেষ হয়ে আসা জোনাকপোকার বৃত্তাকার মিছিলের মতো লাগে অথবা ছিটতে থাকা তারাবাতির একেকটা ডটের সমাহারে ডিজিটাল বৃত্ত তৈরি করে। বিষু লক্ষ করে সে যতই মিছিল অথবা বৃত্তটার কাছাকাছি আসতে থাকে ততৈ বড় হতে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে অন্ধকার সরে গিয়ে আলোটাও বড় হতে থাকে একই সাথে মৃদু লয়ে। যে বৃত্তে মিছিলে বিষু জোনাকপোকা অথবা ডট হয়ে যোগ দেয়।

মন্তব্য, এখানে...
Share.

জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলায়। প্রকাশিত বই: জীবন্মুক্ত বাতিঘর (গল্পগ্রন্থ, প্রকাশক- বেহুলা বাংলা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭)

Leave A Reply