Friday, 20 May, 2022

ফাঁক ফাঁক করে বোনা সুতার আচ্ছাদনবিশিষ্ট মানুষ : সিদ্দিক বকর

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

মোবাইলের পর্দায় অনেকক্ষণ চোখ রাখলে এক সময় দুচোখ ভরে উঠে আলোয়। চোখ উপচে পড়ে স্মার্টফোনের নীল আলোকরশ্মি। রেটিনার চেতনায় ক্লান্তি এসে ছন্দের পতন ঘটায়। চোখ বুজলে চোখের বাহিরের দুকোণ থেকে দুটি রেখা আড়াআড়িভাবে নাকের নিচে, ঠোঁটের ওপরের ভাঁজে এসে এক কোণ তৈরি করে। তখন মনে হয় দুটি রেখা বেয়ে একের পর এক আলোর ফোঁটা মার্বেল গড়িয়ে গড়িয়ে আসে- কোণে এসে হারিয়ে যায়। মনে হয় পাহাড়ের চূঁড়া থেকে নেচে নেচে গড়িয়ে পড়ে পাথরের অসংখ্য নুড়ি- নুড়ির ঘর্ষণে ফুটে উঠে আগুনের ফুল- পাথরের নুড়ি নয় নেচে নেচে গড়িয়ে পড়ে অসংখ্য আগুনফুল।

সেদিনের পর থেকে চোখ বুজলে আলোর মার্বেল নয়, পাথরের নুড়ি নয়, আগুনের ফুল নয় ভেসে উঠে চোখের পর্দায় চর কাছিমনগরের নগর অধিপতি মুললুক চাঁদ ভূঁইয়া চৌধুরী। ভেসে উঠে অন্ধকারে দৃশ্য হয়ে- গ্রাম্য সরু খাল বেয়ে বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়ার সাথে ময়লা-আবর্জণার মতো তার জীবন- ঢুকে পড়ে চোখের রেটিনায়। মিশে থাকে বাতাসে মুললুক চাঁদ ভূঁইয়া চৌধুরী শুকনো মরিচের গুড়ো হয়ে- চোখ খোললেই ধারালো ও প্রখর ঝালে চোখ পোড়ে যায়।

নগরঅধিপতি- একটি চেইন/চেইনের কেন্দ্র। মস্তিস্ক/চোখ/কান- হেড অব কানেক্টেভিটি- নিশ্চিদ্র নেটওয়ার্ক- ফাইবার অপটিকস কানেকশন- হাউজ টু হাউজ। গোটা কলিজাভর্তি বাটি- ঘরে ঘরে ঢুঁ মারে- তিনি বসে থাকেন চূঁড়ায়। এলাকাবাসী সব বোবা/বধির/অন্ধ- চোখ আপন কোটর থেকে বেরিয়ে বাবুই পাখির বাসার মতো ঝুলে থাকে।

সেদিন যে লোকটি চর কাছিমনগর শহরের দক্ষিণ মোড়ে এসে দাড়ালো-দেখা গেল-সে চতুর্দিক মাথা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দৃশ্যগুলো জিহ্বা দিয়ে চাটে। সেই স্বাদ নেই- খোলা হাওয়ার স্বাদ/খোলা মনের স্বাদ/হাসিকান্নার স্বাদ/নির্মল শান্তির স্বাদ/অন্তরে অন্তরে মিলনের স্বাদ/পশুপাখির জীবন যাপনের স্বাদ/বৃক্ষের বেড়ে উঠার স্বাদ/নদী বয়ে চলার স্বাদ। পিছনের গুদাম ঘরটা এক সময় সিনেমা হল ছিল বলে জিহ্বায় চট চট করে স্বরণ করিয়ে দেয়। তাকানোর সাথে সাথে নায়ক রাজ্জাক এসে তাঁর চাঁদের মতো চোখে ঝলক তুলে একটু রংবাজী করে, কবরীর ধুৎ শব্দটা ঘুম ভাঙা সকালের কন্ঠ বেয়ে আছড়ে পড়ে। এখন কেমন ঘরটার সারা শরীর জুড়ে রঙ উঠে গিয়ে ছোপ ছোপ দাউদের বাসা। চতুর্দিকের গাছ-বৃক্ষের মাথায় পাতার সবুজ চিক চিক চর্বি নেই। ডালগুলো হাত পায়ের আঙ্গুলের কঙ্কালের মতো আকাশের দিকে ছড়িয়ে আছে।

এ লোকালয় কোথাকার, খুব চেনা-জানা পরিচিত লোকালয় কেমন অপরিচিত হয়ে উঠছে। কিছু কিছু মানুষ, যাদের সাথে খুবই সখ্য ছিল- এই যেমন সাইকেল মেকার, লন্ড্রি বয়, চা স্টলের লোকটা, হোটেল বয়, মুদি দোকানদার, ফটো স্টোডিওর ছেলেটা, ফার্মেসির লোকটা – তারা সবাই কেমন বিক্ষিপ্ত বিপন্ন- ঝড় তুফানে টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ঘরের মতো মনে হয় একেকজনকে। ওরা পরস্পর পরস্পরের দিকে না তাকিয়েই চলাচল করে ও থেমে থাকে। বাজারের কোণে কোণে জায়গায় জায়গায় মানুষেরা বসে থাকে নাকি দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক বুঝা যায় না। বাজারের দোকান-পাট খোলা, মালামাল নেই- মালামাল যা কিছু আছে তাকে ঠিক মালামাল মনে হয় না ধূলায় ডুবে আছে। মনে হয় এ এক প্রাগৈতিহাসিক বাজার লোকালয়ের টেরাকোটা। মানুুষ যা কিছু আছে সবাই কেমন অন্ধ লোকের মতো। চোখ আছে। চোখে বস্তুর কাঠামো তৈরি হয় না। তাই অন্ধের মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাটে। পা ফেলে মাটির অবয়ব বুঝে বুঝে। বাজারে আসে, দোকানে দাঁড়ায়। প্রয়োজনীয় পণ্যটির জন্য ভেতরে আকুলতা আছে বুঝা যায়। কথা সরে না সবার জিহ্বা কাটা। দোকানির ভেতরে পন্য বিক্রির ব্যকুলতা নিয়ে কাতরায়। পণ্যদের পাত্র আছে পণ্যরা ভাসছে জলোচ্ছ্বাসে- হাত ধরে ক্রেতার হাতে তুলে দেয়ার শক্তি অসাড়।

বাইপাস সার্জারি করা বাজার। বাজারের পেট কাটা দাগের রাস্তাটি চলে গেছে উত্তর দিকে। উত্তর প্রান্তে বাজারের মাথা। আমি দাঁড়িয়ে আছি লিঙ্গ বরাবর। আমাকে উরুসন্ধিতে রেখে বাজারের বাম পা চলে গেছে পূর্বে নদীতে, ডান পা চলে গেছে পশ্চিমে চরে। রাস্তা দিয়ে কেউ কেউ হাটে বাঁশের সাঁকো দিয়ে মানুষ যেভাবে হাঁটে। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় বাজারের স্বরূপ।

উত্তর দিক থেকে একটা ড্রাম গড়িয়ে গড়িয়ে আসে। আসে। পিছনে একজন তাকে ঠেলে ঠেলে ক্লান্ত হয়। যখন চোখের আলোয় ড্রামটি গঠিত হতে থাকে তখন দেখা যায় ড্রাম ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে একটা ঘোড়ার গাড়ি। ঘোড়ার গাড়ির বাতাসে ড্রামের গড়াগড়ির আওয়াজে যে সকল মানুষ বাজারে ছিল তারা সবাই নিজের প্রাণকে আঁকড়ে ধরে থাকে। নত করে মস্তক, যে যেখানে ছিল মূর্তিমান স্থির হয়ে থাকে।

মোড়ে এসে ড্রামের মতো ঘোড়ার গাড়িটি থামে। ড্রামের ভেতর থেকে একজন মানুষ ঘোড়ার গাড়ির ছাদ ফুঁড়ে আস্তে আস্তে দাঁড়ায়। এখন সে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে ডান হাত উপরে তুলে করতল ছড়িয়ে নাড়ে। মানুষ দেখল মাথার উপর দোলছে একটি বিষধর সাপের ফণা। ভয়ে আতংকে চোখ বুজে আসে, ডান দিকে ঈষৎ কাত হয়ে পড়ে মাথা, দুহাত উলটিয়ে মাথাকে আড়াল করে প্রত্যেকে জড়বস্তুতে আবর্তিত হয়। এমন এক অবস্থায় সে ভাষণ দেয়। কথা সরে না। মেমোরি হ্যাঙ হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের মতো ঘুরতে থাকে ঘুরতে থাকে ঘুরতে থাকে- ওপেন হয় না তার ভাষণ। মিডিয়ার লোকজন ছবি তুলে জিহ্বা লটকে হাফায়- পাশাপাশি হাফায় গরমে জব্দ হওয়া সারমেয়। মানুষ কোনো কথা বলে না। সবার জিহ্বা সামনে থেকে কাটা। বাজারে উপস্থিত সকল মানুষ মানসিক প্রতিবন্ধীতে রূপান্তরিত হয়। মাথা কাত করে জড়সড়ো অসাড় পড়ে থাকে।

কথা এক সময় স্পষ্ট হয়- আমি এই নগরের অধিপতি, আমি এই চর কাছিমনগর পরগনার জমিদার। জমিদার মুললুক চাঁদ ভূঁইয়া চৌধুরী। এ কথা বলে এই পরগনার জমিদার বুক উচিয়ে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আকাশের দিকে তাক করে দাঁড়ায়। মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে একটি গ্র্যানেড উড়ে গিয়ে বার্স্ট হয়। প্রচণ্ড শব্দে চতুর্দিক কেঁপে ওঠে। বিপন্ন অসাড় মানুষগুলো স্প্লিন্ডার বিদ্ধ হয়ে অন্ধের দৃষ্টি যেন অনিষিক্ত শুক্রাণুর মতো কেঁপে কেঁপে দৌড়ে। ডালে ডালে পাখিগুলো আতংকে পাখা ঝাপটিয়ে শূন্যে ভেসে ওঠে। একাধিক দোয়েল তড়িৎ উড়ে যেতে চেয়ে মানুষের মাথার উপর এসে আটকে থাকে। জমিদার মুললুকের ভয়ে শিষ দিতে গিয়ে কন্ঠ ছিঁড়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরুই। জনগণ উপর দিকে তাকালে সবার চোখ দোয়েলের রক্তে পোড়ে। এবার জমিদার মুললুক চাঁদ ভূঁইয়া চৌধুরী ম্যাগজিন খালি করা এক ভাষণ দেন। তার ভাষণের ম্যাগজিন খালি করা বুলেট শব্দগুলো সকল মানুষকে আবারো বিদ্ধ করে। এভাবে মানুষ অনবরত বিদ্ধ হতে হতে চর কাছিমনগর পরগনার সকল মানুষ ঝাঝরা হয়ে এখন জালের রূপে/জালের জীবন নিয়ে বেঁচে আছে- ফাঁক ফাঁক করে সুতায় বোনা মানুষ। জমিদার মুললুক চাঁদ প্রতিমাসে ঠিক এইখানটায় এসে তার প্রাণপ্রিয় প্রজাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

যে অধিভুক্ত এলাকার জমিদার তিনি সেই এলাকার প্রজাদের জন্য হাতে নেয়া হয়েছে দারিদ্র বিমোচন এক মহা পরিকল্পনা। সকল গরীব শ্রেণি বেওয়ারিশ ঘোষণা করা হয়েছে। গরীব হলো বেওয়ারিশ কুকুর। সকল কুকুরের শরীর থেকে বেওয়ারিশ শব্দকে উলটো ছিলে ছাল তুলে নেয়া হবে। তার পরগনায় কেউ গরীব থাকবে না।

ফলপট্টিতে কিছু বেওয়ারিশ কুকুর শুয়ে বসে অলস সময় কাটায়, ফলপট্টিসহ আশপাশের আরো কিছু এলাকার পাহাড়ায়। পাশ দিয়ে কেউ গেলেই মাথা তুলে তাকায়, ব্যাটারি চালিত পুতুলের মতো চোখের পাতি ফেলে। হঠাৎ দৌড়ে এসে কাপড়পট্টির একটি বেওয়ারিশ কুকুর ঢুকে পড়ে ফলপট্টিতে। অমনি ফলপট্টির সব বেওয়ারিশ কুকুরেরা মুখের ভেতর সাজানো চাপাতি বের করে পলট খেলতে থাকে। কাপড়পট্টির কুকুরটি ভরকে যায়। সমুহ বিপদ থেকে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করা যায় সে কৌশল নেয়। নিজের লেজ গুটিয়ে আত্মসমর্পণ করে গুটি গুটি পায়ে পিছাতে থাকে। আত্মসমর্পণ করার কারণে ফলপট্টির কুকুরেরা সহসা আক্রমণ করে না। কিছুদূর পিছিয়ে কাপড়পট্টির কুকুরটি ক্ষীপ্র গতিতে ঘুরেই ঝাড়া এক দৌড় দিবে অমনি আর বিলম্ব না করে দুপাশ থেকে দুটি কুকুর একসাথে আক্রমণ করে বসে। একটি সামনে টুটি বরাবর কামড়ে ধরে যেন চাপাতির কোপ বসিয়ে দেয়, অন্য কুকুরটি পেছনের দিক নিতম্বে কামড়ে চাপাতি দাঁত বসিয়ে ধরে রাখে। সাথের অন্য কুকুরগুলি ক্ষীপ্র গতিতে এসে হামলে পড়ে, প্রত্যেকে চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কোপায়। রক্তে ভিজে লাল হয়ে যায় রাস্তা। এদিকে হৈ হৈ করে মানুষ আসে দৌড়ে পড়িমরি, সেদিকে কাপড়পট্টি থেকে একদল কুকুর আসে দৌড়ে বেজান। এর পূর্বেই ফল পট্টির কুকুরেরা দ্রুত সরে যায়। এখন মানুষ ও কুকুরের দল সবাই চুপ। রাস্তার মাঝে লাশ।

জমিদার মুললুক চাঁদ ভূঁইয়া চৌধুরী জরুরী অবস্থা জারি করে তার পরগনায়, জরুরী নগর পরগনা প্রতিনিধি সভা ডাকে- সিদ্ধান্ত হয়, পরেরদিন সকাল ১০টায় জরুরী ভাষণ।

পরেরদিন সকাল। দেখা যায় সেই ড্রাম গড়িয়ে গড়িয়ে আসে। ক্রমে ক্রমে একটি ঘোড়ার গাড়ি বেরিয়ে আসে। দেখা যায় ঘোড়ার গাড়ির মঞ্চে একটি কফিন। সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটি লাশ। সবাই যখন কৌতুহলে পিষ্ট হচ্ছে- এমন সময় ভেসে আসে ঘোষণা- আজ ভোরে কিছুসংখ্যক নীতি ভ্রষ্ট দুর্বৃত্তের গুলিতে সবার প্রাণপ্রিয় নেতা, চর কাছিমনগরের দুইবারের নির্বাচিত মেয়র মুললুক চাঁদ ভূঁইয়া চৌধুরী নিহত হয়েছেন। লাশ শহীদ মিনারে রাখা হবে প্রাণপ্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্যে।

মানুষ আরো আতংকে পড়ে যায়। শরীরের ভিতর অতিরিক্ত আতংকে মূল অর্গ্যান সিস্টেমে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে প্রচুর হিলিয়াম গ্যাসের সৃষ্টি হয়। ফলে সহসা সকল মানুষের পারমাণবিক ভর যায় কমে। একেকজন মানুষ পরিণত হয় একেকটা বেলুনে- যে যেখানে ছিল সেখান থেকেই সবাই ধীরে ধীরে উড়ে যায় আকাশে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
সিদ্দিক বকর

সিদ্দিক বকর

জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলায়। প্রকাশিত বই: জীবন্মুক্ত বাতিঘর, (গল্পগ্রন্থ, প্রকাশক- বেহুলা বাংলা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭), করাতকাটা ঘুম (গল্পগ্রন্থ, প্রকাশক- ঘোড়াউত্রা প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০২২)