জন্মের অধিক : রাজিয়া নাজমী

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

ময়ূরী, চুপ করে কি ভাবছো? তুমি  রাখবে তো?

জয়ন্ত, তোমার পায়ের উপরে যখনই হাত পড়ে, আমি যে একই কথা ভাবি, তুমি…

আমার এই পা নিয়ে  তোমার কী…।  আমি বুঝি ভাবনা হবারই কথা। বাচ্চাটা যদি মাঝরাতে কেঁদে ওঠে আমি যে সাথে সাথেই দৌড়ে যেতে পারবো না।  গতরাতে তুমি ঘুমের ঘোরে পানি চাইলে আর আমার কত সময় লেগে গেলো এক গ্লাস পানি আনতে।  এত সময় লেগে যায় এটা লাগাতে; আমারও খারাপ লাগে ময়ূরী, তবে…

জয়ন্ত আমি যে এসব কিছুই ভাবছি না। আমি ভাবছিলাম…

ভেবো না ময়ূরী, আমি  ঠিক ব্যবস্থা করবো।

আহ; জয়ন্ত,  আর একটা এমন কথা নয়।  পা নিয়ে  তোমার এই দুঃখী ভাব আমার ভালো লাগে না।  একটা দুধের বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে  তুমি তোমার পা হারিয়েছে।  যোদ্ধারা যুদ্ধে যায়, অঙ্গ হারায়, অঙ্গ কেড়েও নেয়।  সেদিনের সেই জীবন যুদ্ধে তুমি অঙ্গ হারিয়ে কারো লাশের উপর হেঁটে আসো নাই – কাঁধে করে বয়ে এনেছে অক্ষত একটি শিশুকে – তুলে দিয়েছে মায়ের কোলে। কেনো গর্বিত হও না  তুমি?

ময়ূরী, কত সহজে অভাব মেনে নিতে পারো  – তোমাকে যে তাই আমি এত ভালবাসি।  আমাদের  সন্তান যেন তোমার মতই হয়। তোমার মত দেখতে, তোমার মত সবটাই। 

না; জয়ন্ত অনেক কিছু  মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও আমি সব পারবো তা নয়।  তুমি অনেক ভালো বাবা হবে এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমি জানি না ভালো মা হতে পারবো কি না। আমি তাই মা হতে চাই না।

এবার তুমি চুপ করো।  তুমি নিজেই জানো না তুমি কত ভাল মা হবে।

জয়ন্ত আগামী মাসে আমার অডিশন। এই প্রথম একজন ডিরেক্টর তার ছবির নায়িকা হিসাবে আমাকে নিতে চাইছে। আমার এতদিনের স্বপ্ন যে শেষ হয়ে যাবে বাচ্চার জন্য। আমার  এত দিনের সাধনা শেষ হয়ে যাক; এ তুমি চাও?

দোহাই তোমার, না হয় একটি বছর ত্যাগ করলে! আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। তুমি শুধু আমাদের ওকে জন্ম দেও। এই তো প্রায় দুমাস ধরে ও তোমার ভিতরে একটু একটু করে বড় হচ্ছে। আর তো মাত্র সাতমাস, তারপরে আমি ওকে বড় করবো।

জয়ন্ত, সুযোগ সব সময়ে আসে না। 

নায়িকা হবার জন্য আমাদের সন্তানকে মেরে ফেলবে?  

মেরে ফেলছি  সন্তান? যার কোন আকার হয়নি, শুধুমাত্র একটা ভ্রূণ এখন। 

এই ভ্রূণ বড় হয়ে তোমার আমার সন্তান হবে। ওহ ভাবতেই যে কী আনন্দ লাগে।  মেয়ে বা ছেলে যাইহোক ময়ূরী দেখবে ও  তোমার মত হবে। আমার চোখের দিকে তাকাও ময়ূরী। দেখতে পাও আমার আনন্দ!

ময়ূরীর তাকিয়ে থাকা চোখে চোখ রেখে জয়ন্ত বলে, তোমার এই ভাবনা মাথা থেকে ঝেরে ফেলো সোনা। কালই আমরা বিয়ে করবো। এই নিয়েও তুমি আর কথা বলবে না। এখন আর আমাদের দেরি করার ঠিক হবে না।

তুমি অডিশনটা এখন দিয়ে রাখ।  ডিরেক্টর ঠিক এই পরিস্থিতি বুঝবে। বাচ্চা হয়ে যাওয়ার পরে না হয় … আরো তো কত ছবি উনি বানাবেন। তাছাড়া তুমি তো জানো এ লাইনে আমার চেনাজানা আছে।

ময়ূরী আর কোন তর্ক করলো না। পাশ ফিরেও ঘুমালো না। যেমন করে রোজ ঘুমায় তেমন করেই জয়ন্ত’র বুকের মাঝে নিজেকে সম্পূর্ণ জরিয়ে  নিয়ে আদুরে গলায় বলল,তুমি এত ভালো কেন !

জয়ন্ত  ময়ূরী’কে আরো কাছে টেনে  নিয়ে  বলে, কে বেশি ভালো তা সময় বলে দেবে। এখন ঘুমাও।

রোজকার চাইতে আজ আরও  সকালে জয়ন্তের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। গায়ের উপর থেকে  সযত্নে ময়ূরীর হাত সরিয়ে নিজের মাথার বালিশে ময়ূরীর হাত রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো।

ময়ূরীর সকালের ঘুম বেশ গাড়।  রাত জাগতে আপত্তি নেই কিন্তু সকালে বালিশ ছেড়ে উঠতেই পারে না। কপালের উপর থেকে আস্তে করে কয়েক গাছা চুল সরাতে সরাতে ঘুমন্ত ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে হাসল। মনে মনে বলল পাগলী, শেষতক আমার কথাই মানলো কিন্তু কত তর্ক করলো।

রাতের পোশাক ছেড়ে পাঞ্জাবী পাজামা পরে জয়ন্ত  রাস্তায় বের হতেই ভোরের ঠাণ্ডা ঝিরঝির বাতাস গায়ে লাগে। শীতের বাতাস বলেই কী এত শান্তি লাগছে? চেনা রাস্তা চেনা চারপাশ  জয়ন্ত কখনই এত ভালো করে দেখেছে বলে মনে পড়ে না! রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখে নিজেকেই শোনালো – জয়ন্ত সবাই সুন্দর শুধু তোমার মনের চোখ বন্ধ ছিলো হে।

 একটা খালি রিকশা কাছে আসতেই জয়ন্ত বলে, ভাই বেইলী রোডে ফুলের মার্কেটে চলো। রিকশায় উঠেই  মোটামুটি ঠিক করে নিলো আজ অফিস কামাইর জন্য যুক্তি কী দেবে।  তারপর  কাজী অফিস, ময়ূরীর প্রিয় রেস্তোরা।  ওহ মাথায় থেকে একদম সরে গেলো কী করে একটা শাড়ি কিনতে হবে কাজীর অফিসে যাওয়ার আগে। না, একা কিনবে না। ময়ূরী’কে সাথে নিয়েই কিনবে। জয়ন্ত শাড়ি টারি বোঝেও না; তার উপরে ওর পছন্দের সাথে ময়ূরীর পছন্দের খুব একটা না একেবারেই মিল নেই। 

রিকশা  শান্তিনগরের মোড় কেটে বেইলী রোডের দিকে চাকা ঘোরাতেই মনে পড়লো এক বছর আগে আচমকা  এই মোড়েই এক বিকেলে ময়ূরীর সাথে দেখা হয়েছিলো।  চেনাজানার শুরু থেকেই ওদের মধ্যের অমিলের চাপে মিল খুঁজেই পাওয়া যায় না। তারপরেও ওরা একজন আরেকজন থেকে দূরে যেতে পারে নাই।

একবারে বিপরীত চরিত্রের দুজনের এত অমিলগুলোই কী ওদের ভালবাসার অনুষঙ্গ? কে জানে!  

জয়ন্ত একটু ঝুঁকে হাঁটুর নিচ থেকে নকল পায়ের উপরে হাত ছোঁয়াল। এই একটি অভাবের জন্য কতজন কাছে এসেও সরে গিয়েছে। অথচ ময়ূরীর কাছে এই অভাবের কোন গুরুত্বই নেই।  রোজরাতে নিজের হাতে খুলে দেয় আলগা পা।  জয়ন্ত অনেকবার তখন তাকিয়ে  দেখেছে ওর চোখ।  কখন করুণা চোখে পড়ে নাই। জয়ন্ত তাই  কেয়ার করে না ময়ূরী কতটা অগোছালো, বেহিসাবি।  ময়ূরী মাঝেসাজে রান্না করতে গেলে  কোন গ্রহ থেকে রান্নার রেসিপি নিয়ে আসে খোদা মালুম। সেই রান্না এই গ্রহের কেউ খেতে না পারলেও জয়ন্ত কোনভাবে ঠিক খেয়ে নেয়। ময়ূরীর চোখের দিকে তাকালে কোন দোষ যে জয়ন্তের পক্ষে ধরা সম্ভব না।  তবে একদিন ওর খুব পছন্দের সার্ট আয়রন করতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলায় জয়ন্তর খারাপ লেগেছিলো। মেজাজ ঠিক করতে অনেকক্ষণ বাথরুমে বসে ছিলো। ময়ূরীর মধ্যে কোন অপরাধবোধ না দেখে অবাকও হয়েছিলো।

পরদিন ময়ূরী একবারেই নিজের পছন্দের একটা সার্ট কিনে এনে জয়ন্তের গায়ে মেলে ধরে বলে, মন খারাপ করো না। ওটা তো অনেকদিন পরেছ। জয়ন্ত সার্টের রঙ দেখে অবাক চোখে তাকাতেই ময়ূরী বলে কী সব হালকা রঙ পর সবসময়।  লাল রঙ্গের এই চেক সার্ট দেখে আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না। জয়ন্ত সার্ট হাতে নিয়ে বলে, শার্ট পুড়িয়ে খুব মন খারাপ লেগেছে বুঝি। তুমি যেমনই কেনো, কিনেছো সেটাই বড় কথা।  ময়ূরীর কপালে আদর করে 

শার্টটা আলমিরাতে তুলে রাখলো ।

জয়ন্ত জানে এই শার্ট ওকে পরতে হবে না।  ময়ূরীর এই শার্টের  কথা  মনে থাকবে না। ও যে  সকালের  কথা বিকেল যেতেই ভুলে যায়। সুধু একটি মুহূর্তের কথাই ও যেন ভুলতে পারে না।  পারে না বলেই যেন চঞ্চল অস্থির ময়ূরীর চায়ের কাপ দুহাত দিয়ে এমনভাবে ধরে যেন মহার্ঘ কিছু আগলে আছে।  কিন্তু না, ময়ূরীর  দুইহাত দিয়ে  চায়ের কাপ জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে  ঠোঁট নামিয়ে চুমুক দেওয়ার পেছনে আছে নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা।  গরম চায়ের কাপে হাত নিয়েই ময়ূরী খুব শান্ত খুব ধীরস্থির সাবধানী হয়ে যায়। চোখে যেন এখন অতীতের কোন ব্যথা, কোন জ্বালার  ছায়া থাকে।  গরম চায়ের কাপ ও আর কোনদিন বোধহয় দুইহাত ছাড়া ধরতে পারবে না। কাপ ধরার এই ভঙ্গির ভিতরে অতীতের সেই  মুহুর্ত সবসময় বর্তমান রয়ে যাবে। 

জয়ন্তও কী ভুলতে পারবে সেদিনের বিকেলের  কথা?  অফিস থেকে বের হয়ে সিএনজি’র অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলো শান্তিনগরের মোড়ে। নয়তো সে রোজ রিকশায়ই যায়। রাজারবাগের মোড়ে নেমে, একই রেস্তোরাঁ থেকে কখন খেয়ে কখন প্যাকেট করে রাখা  রাতের খাবার নিয়ে বাকি পথ হেঁটেই বাড়ি ফেরে।  সেদিন বাড়ি না ফিরে  মিরপুরে  যাওয়ার তাড়া ছিলো। ছোট বোন দুপুরে অফিসে ফোন করে বলেছিলো মায়ের  শরীর ভালো না। মিরপুরে দূরে বলেই যে যাওয়া হয় না তা নয় বোনের স্বামীর সাথে একটা বাক্য ব্যয় করতে হবে ভাবলেই আর যাওয়া হয় না।  মা’কে নিজের কাছে রাখাও সম্ভব না।  বোনটার কাছেই রাখতে হলো বিধবা মা’কে।

বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরে একটা  সিএনজি রাজি হলো মিরপুরের দিকে যেতে। জয়ন্ত কেবল এক পা তুলে উঠতেই ঝড়ের বেগে একটি মেয়ে এসে বললো, ভাই আপনি আমাকে এই গাড়িটা ছেড়ে দিন।

ড্রাইভার আমাকে এখুনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে চলেন। না  কইরেন না। আমার শরীররে গরম পানিতে জ্বলে গেছে। কষ্ট হচ্ছে খুব।  ড্রাইভার হতবাক হয়ে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। জয়ন্ত  মেয়েটির দিকে তাকাতেই দেখে ওর গায়ের কামিজের অনেকটাই ভেজা। জয়ন্ত সিএনজি’র সিটের একপাশে সরে বসে বলে, উঠে আসুন। আমিও ওদিকেই যাবো। ড্রাইভারকে ইশারা করে বললো, চলেন ভাই।

গাড়িতে উঠে বসতেই জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করলো, খুব বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে?

জয়ন্তর প্রশ্নের জবাব না দিয়েই যন্ত্রণায় ভাঙা স্বরে বললো, আমি ময়ূরী। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

হাসপাতালের সামনে  নেমে  ময়ূরী আবার ফিরে তাকায় – এবার অসহায় নয় লজ্জায়। জয়ন্ত বুঝেই সাথে সাথে বলে, ভাড়ার টাকা নিয়ে চিন্তা করবেন না ।

ময়ূরী  জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে বলে, বাড়ি থেকে তারহুরো করে বের হয়ে গেছি, আমি বরং একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি  ফিরে যাই। আপনি চলে যান।

হাসপাতালে না ঢুকে রাস্তার দিকে পা বাড়াতেই জয়ন্ত ময়ূরীর হাত ধরে বললো  হাসপাতালের  বিল আমার কাছ থেকে ধার নেবেন। চিকিৎসা না করে ফিরে যাচ্ছেন কেন? চলুন ভেতরে। 

জয়ন্ত পেমেন্ট করেই ফিরে যাবে বলে ভাবলেও নার্সের কাছে ময়ূরীর অ্যাকসিডেন্টের বর্ণনার একটু কানে আসতেই থেমে গেলো।  কী বলছে মেয়েটা?  ওর স্বামী ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের মগ ওর গায়ের উপর ছুড়ে ফেলেছে? শুধু চায়ের পানি গরম করে  কেটিলি জায়গা মত রাখে নাই বলে? লোকটা কী পাগল নাকি?

নার্স বললো, ইশ মুখটা তখন চট করে না সরালে যে আপনার মুখ পুড়ে যেতো। বড় বাঁচা বেঁচেছেন কামিজের উপর পানি পড়ায়।

জয়ন্ত কাছে এসে বললো, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।

ময়ূরী কিছুক্ষণ পরে হাতে একটা কাগজ নিয়ে এসে এমনভাবে দাঁড়ালো যেন জয়ন্ত  অচেনা নয়, কাছের একজন।

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে পাশের ফার্মেসিতে ঢুকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে ওষুধের ব্যাগ হাতে নিয়ে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে এই প্রথম ময়ূরী বলে, আপনার ফোন নাম্বারটা আর অফিস অথবা বাড়ির ঠিকানাও  লিখে দেন। আপনি যা করলেন তার জন্য ধন্যবাদ  শব্দটা অনেক ছোট। আবার তেমন বড় কিছু দেবার সামর্থ্য আমার নেই।  আমি বরং ঋণী থেকে যেতে চাই আপনার কাছে। সব ঋণ শোধ করা যায়? না করার ভিতরে  কী আনন্দ পাওয়া যায় না গ্লানি ভর করে?

জয়ন্ত তাকাতেই ময়ূরী বলে, নাহ; আপনাকে প্রশ্ন করছি না । নিজেকে করলাম।  

জয়ন্ত কাগজে ঠিকানা লিখতে লিখতে বলে, কোথায় যাবেন ?

যেখান থেকে এসেছি  সেখানেই। তবে বেশিদিনের জন্য না।

আজ যাওয়া ঠিক হচ্ছে? 

না, আজ আর কিছু হবে না। আগামী মাসে ও এক বছরের জন্য বাইরে যাচ্ছে। আমার যা ব্যবস্থা আমি তখন করবো।

আজই প্রথম?

গরম পানি ছুড়েছে আজ। তবে গায়ে হাত তোলা অভ্যাস।

কতদিন?

একবছরের সংসার।

 ওহ,

 খালি একটা সিএনজি ওদের সামনে  থামতেই, দুজনেই উঠে বসে। পথে আর কোন  কথা হয় না। শুধু একবার ময়ূরী উফ করে উঠতেই জয়ন্ত ওর দিকে না তাকিয়ে বলে- পোড়ার জ্বালা কমতে সময় লাগবে। মলম নিয়ম করে লাগাবেন তাতে দাগ থাকবে না।

একটু থাকলেও অসুবিধা নেই। আজকের এই সন্ধ্যেটা মনে করাবে। ময়ূরী আরও কিছু বলতো কিনা কে জানে – সিএনজি বাড়ির সামনে থামতেই জয়ন্তের দিকে তাকালো এমনভাবে যেন এই মুহূর্তে এই সিএনজি ওর ঘর আর সেই ঘর ছেড়ে যেতে হচ্ছে যেখানে যেতে মন চাইছে না।

অন্ধকার আর লাইট-পোস্টের মিটমিটে আলোর ভিতর দিয়ে  ময়ূরী গেটের ভিতরে ঢুকলেও জয়ন্ত আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। হঠাৎ করেই কে যেন উপর থেকে বলছে, জয়ন্ত চলে যান। আমি ঠিক আছি।কাল ফোন করবো।

বিকেলের  আচানক ঝক্কির কয়েক ঘণ্টা পরে জয়ন্ত এবার  হাসল। কী করে ময়ূরী  ঠিক ভেবে নিয়েছিলো – জয়ন্ত অপেক্ষা করবে। তাহলে কী জয়ন্তকে বোঝা অত কঠিন না?

ময়ূরীর  জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হতে যত ঝামেলা হবার তা না হয়ে মেঘ না চাইতে বৃষ্টি এলো’র মত হলো।  ওর স্বামী প্রাগের কোন কলেজে  পড়তে যাওয়ার আগে নিজ থেকেই  ডিভোর্সের প্রস্তাব দিলো। একবছরের বিবাহিত জীবনে একটাই ভালো কাজ করে  গেছে লোকটা । নিজের এপার্টমেন্ট ভাড়া না দিয়ে ময়ূরীর কাছে ভাড়া দিয়ে বলেছে ভাড়ার টাকা ওর বাবামায়ের ঠিকানায় পাঠাতে।

শুনে জয়ন্তের মনে হয়েছে সব মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের দয়া একটু হলে বাসা বাঁধে।  নয়তো একজন ডিভোর্স মহিলার বাড়ি ভাড়া পাওয়া এত সহজ হতো না। যদিও ময়ূরী বেশিরভাগ সময় জয়ন্তর ওখানেই থাকে। বাবার রেখে যাওয়া বাড়িতে জয়ন্তর স্বাধীনতা অনেক বেশি। ময়ূরী তার সবটাই ভোগ করে।

রিকশাওয়ালা এতক্ষণ ধরে বোধহয় কথা বলেই যাচ্ছিলো।  হঠাৎ ওর একটা কথা কানে জোরে এসে লাগলো। জয়ন্ত একটু ঝুঁকে বলে, কি করেছি আমি?

আপনে সূর্য ওঠনের আগেই কপালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকাইলেন, সূর্য তো এহনো খাঁ খাঁ গরম ছড়ান শুরু করা নাই।

না রে ভাই, আমি কপালে হাত দিয়ে ভোরের কোমলমতি সূর্যকে দেখছিলাম।

সূর্য পুরুষ না?

মানে ?

না আপনে কইলেন কোমলমতি। এইটা তো মা বইনগো কয়। আমার বাবায় কইতো,  বেডা মানুষ  হওয়ন লাগে সূর্যের লাহান শক্তিশালী- তেজবান। আলো দিবো আবার তেজ দিয়ে পোড়ায় দিবো। সংসারে পুরুষমানুষ তেমন না হইলে চলবে কেমনে। বাবায় কইতো ঘরের স্ত্রীলোকের স্বভাবে থাকন দরকার চান্দের আলো মত। রাইতে যেমন চান্দের আলো ছড়ায়। সংসারেও হেরা তেমন আলো ছড়ায়।

জয়ন্ত লক্ষ্য করেছে অল্প  বয়সী রিকশাচালক সাধারণত তেমন আলাপে যায় না। হয়ত ওদের জীবনে এখনও তেমন অভিজ্ঞতা নেই – ওদের মনে হয়তো আছে কোন নারী – আছে সংসার বাঁধার  স্বপ্ন। যা নিয়ে যাত্রীর সাথে আলাপ করা যায় না। সবসময় মাঝ বয়সীরাই আলাপ জমাতে চায়- অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে বসে।

জয়ন্ত হো হো করে হেসে ওঠে ওর কথায়। বলে, তাহলে ভাই ধরে নেই, সকালের সূর্য যে তেজবিহীন আলো ছড়াতে ছড়াতে  ওঠে সে নারীর কোমলরূপ। তারপর সেই নারী জন্ম দেয় এক তেজী পুরুষের।  বুজলে কিছু ভায়া? সত্যি কি জানো, এই চাঁদ সূর্যের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে যেমন আছে নারী পুরুষের।

রিকশাআলা রশিদ বলে,  মারফতি কতা। না বুজলেও ভালা লাগলো শুনতে।

একটু চুপ থেকে রশিদ আবার বলে, আপনে এই যে সকালে ফুলের তোড়া কিনলেন, সেই কোমলমতি বইন যেন আপনার সাথে এমনই থাহে। আইজ আপনার একটা খুশির দিন মনে হয় তয় আপনি বেশি ভালা মানুষ। ফুলের দোকানআলা আপনারে ঠকাইছে।  সকালের পয়লা কাস্টমার বনী কাস্টমার,  যে দাম কয়, বনী করতে হে দামেই দেওন লাগব।  আপনে দামাদামি করলেন না, যা চাইলো দিয়া দিলেন।

দূর রশিদ মিয়াঁ, ফুল কি দামাদামি করে কিনতে হয়!  তাহলে ফুলের দাম থাকে?

রশিদ স্বগোক্তি করলো – বড় ভালা মানুষ!

ভাই আফনারে  একটা কতা জিগাই।  মনে কষ্ট নিয়েন না রাগ কইরেন না। আফনার পা কাটা গেলো কেমনে?

না রাগ করার কিছু নাই। কথা তো সত্য। আমার পা হারিয়েছে চিটাগাঙে।  রেললাইনের উপরে একটা তিন বছরের শিশু হেটে যাচ্ছিলো – ট্রেন  দেখেও সে না বুঝে বা ভয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।  ওর মা চিৎকার করে কাঁদছিল – বাকিরাও হতবাক! এখনই চোখের সামনে ছোট শিশুর রক্তাক্ত দেহ পিসে যাবে।  আমি  ছুটে গিয়ে ওকে আমার বুকের ভিতর নিয়ে রেললাইনের পাশে শুয়ে পড়লেও এই পায়ের প্যান্ট আঁটকে গেলো লাইনে। যাত্রীসহ ট্রেন আমার পায়ের গোড়ালির উপরের অনেকটা থেঁতলে দিয়ে চলে গেলো।

রসিদ মিয়ে চুপ হয়ে যাওয়া  জয়ন্ত পরিবেশ হালকা করতেই বলে, তোমার কয় সন্তান?

দুইপোলা। তয় এহন আবার  বউ ছয়মাসের পোয়াতি। হের একটা মাইয়া চাই। আমি আল্লাহ্‌রে কই আমার এই ভালা মানুষ বউয়ের মনোবাঞ্ছা পূরণ কর মাবুদ।

স্যার আফনে কই কাম করেন।

জয়ন্ত আঙুল উপরে তুলে কয়েকটা উঁচু বিল্ডিং দেখিয়ে বলে, এইসব বাড়ি তোলার অফিসে কাজ করি।

ওহ আফনে রিয়ালস্টেটের ব্যবসা করেন!

 জয়ন্ত আবার হো হো  করে হেসে বলে সাবাস , রিয়ালস্টেট ! এটাও জানো। না ভাই আমি টাকা পয়সার  হিসাব দেখি। কী এখন আবার বলবে অ্যকাউনটেন্ট আপনে?

এবার রশিদ  হেসে ফেলে বলে, এটা শক্ত লাগে কইতে তয় কী কাম তা বুঝি।  ক্লাস নাইনতক পড়া আমার। ম্যাট্রিক দেওয়নের আগে বাবা ইন্তেকাল করে। ছোটছোট চার ভাই। স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে হোটেলে বাসন ধোয়ার কাম শুরু করলাম। এরপরে রিকশা চালান শুরু করলাম -আমার বয়স তহন বিশ বছর।

জয়ন্তের বাড়ির সামনে রশিদ রিকশা থামালো।  জয়ন্ত  একশত টাকার নোট রশিদের হাতের মুঠোয় দিয়ে বলে, তোমার রিকশায় ঘুরতে ভালোই লাগলো। আবার দেখা হবে তোমার সাথে।

রশিদের কী গলা ধরে এলো! মুখ নিচু করে মাথা ঝুঁকিয়ে রিকশা টান দিলো।

জয়ন্ত ঘরে ঢুকে হাত ঘড়ির দিকে তাকালো।  সারে ৯টা  বাজে। ময়ূরী সাধারণত ৯টার মধ্যেই উঠে যায়। শুয়ে শুয়েই টিভি অন করে। আজ কোন সাড়াশব্দ নেই। আজ কী একটু বেশি ঘুমাচ্ছে? নাকি ঘুম থেকে জয়ন্তকে না দেখে মেজাজ বিগড়ে এখনও শুয়ে আছে। 

জয়ন্ত আরও একটু আগেই আসতে পারতো। কিন্তু রশিদ গল্প করতে গিয়ে  অনেক ধীরে রিকশা  চালালেও ওকে তাড়া দিতে খারাপ লাগছিলো।

পা টিপেটিপে জয়ন্ত ফুলের তোড়া পিছনে  লুকিয়ে শোবার ঘরে এসে একটু  হাসল। যাক রাগ করে বিছানায় বালিশে মুখ ঢেকে পড়ে না থেকে বান্দা আজ বিছানা বেশ পরিপাটি করে রেখেছে।

লিভিং রুমে সেন্টার টেবিলের উপরে ফুলের তোড়া রেখে, বাথরুমে  টোকা দিতে ভেজানো দরজা খুলে গেলো।  জয়ন্ত  বারান্দায় উঁকি দিলো – না কেউ নেই। এবার জয়ন্তর ভয় হলো। ময়ূরীর শরীর খারাপ হয়নি তো। কিন্তু ওর সেলফোনে তো কল আসে নাই।  জয়ন্তর খুব গরম লাগছে। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ফোন করলো ময়ূরীর ফোনে। একটা রিং বাজতেই ফুলের তোড়ার পাশে গতকালের বাসি কাগজের পাতা উড়তেই ময়ূরীর হাতের লেখা  চোখে পড়লো। সেলফোন কেটে গেলো দ্বিতীয় রিঙের সাথে সাথেই।

জয়ন্ত খবরের কাগজের ভিতর থেকে সাদা কাগজে ময়ূরীর লেখা বের করে ভাবে, কাগজের ভিতরে কেন লুকিয়ে রেখেছে ? জয়ন্ত যেন আরো অনেক পরে দেখে? কিন্তু কেন? ময়ূরীর এ কেমন খেলা?

প্রথম পাতায় গোট গোটা অক্ষরে লেখা – জয়ন্ত তুমি খুব ভালো কিন্তু তুমি আমার জন্য না। আমি জানি তুমি আমাকে সত্যি ভালোবাসো আমিও।  তবু তুমি আমার জন্য না।

জয়ন্ত পাতা উল্টালো-  আজ এগারোটায় একটা ক্লিনিকে এবরশনের  অ্যাপয়েন্টমেন্ট  – আমি তোমার সন্তানকে তোমার জন্য জন্ম দিতে পারলাম না।

কাজেই আমি তোমার কাছে আর ফিরে আসবো না।  তুমি যা চেয়েছিলে তা না দিতে পারার কষ্ট আমি একদম পাচ্ছি না তা নয় । আমি ফিরে আসলে তুমি গ্রহণ করবে এবং ভালোবাসবে তবে তা আগের মত যে হবে না। একটা চির আমাদের মাঝে থাকবেই।  আমরা এক শহরেই থাকবো। তুমি চাইলে আমার ঠিকানা খুঁজে পাবে। তবে কখন আমাকে ফেরাতে চেও না।

পুনশ্চ: আমি তোমাকে ভালোবাসি। জয়ন্ত এই জীবনে  তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে এতবেশি ভালবাসি নাই। কাউকে এত ভালবাসতে পারবো কিনা জানি না। 

জয়ন্ত আমাকে তুমি কোনদিন ক্ষমা করো না। সব আঘাতের ক্ষমা হয় না। হলে, তা দয়া হয়। সেই দয়া ঘৃণার চাইতে বেশি কষ্টকর।

জয়ন্ত ঘড়ি দেখলো- এগারোটা বাজতে এখনও অনেক বাকি। ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে নিচে নেমে এলো। খালি একটা রিকশা দেখে হাত তুলতেই, কানে এলো কে যেন তাকে দাদা বলে জোরে ডাকছে। সামনে তাকাতেই দেখে রাস্তার ওপাশে মুদি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রশিদ।  রাস্তা পার হয়ে এসে রশিদ বলে, কি ব্যাপার দাদা সবকিছু ঠিক আছে? বলেই অপেক্ষায় থাকা রিকশাওয়ালাকে বলে, ভাই কিছু মনে কইরেন না, দাদারে নিয়ে আমি যামু।

রশিদ নিজের রিকশা ঘুরিয়ে নিয়ে এসে বলে ওঠেন।

মুদি দোকান থেকে কিনা আনা পানির বোতল জয়ন্তর হাতে দিয়ে বলে, কই যাবেন?

রশিদ আমাকে কোন একটা গির্জায় নিয়ে যাবে ভাই, এগারোটা বাজার আগেই!

রশিদ কোন কথা না বলে  এত জোড়ে  রিকশা চালায় যেন কোন  হন্তারকের হাত থেকে দাদার জীবন বাঁচাতে হবে। 

গির্জার সামনে রিকশা থামে। জয়ন্ত নেমে যায়। পকেট থেকে পাঁচশত টাকার দুইটি নোট রশিদের একহাতে দিয়ে আরেক হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে বলে, এখন বাড়ি ফিরে যাও। বউকে এটা দিও।

রশিদের দুই চোখে পানি। ডুকরে কেঁদে বলে, দাদা আপনি!

জয়ন্ত রশিদের কাঁধে হাত রেখে বলে, আমি আমার সন্তানের জন্য একটু প্রার্থনা করবো। আজ এগারোটায় ওর মৃত্যু হবে।   

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
রাজিয়া নাজমী

রাজিয়া নাজমী

গল্পকার, সেইসাথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নির্মোহ ভাষ্যকার তিনি। থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ও অভিজ্ঞানে প্রাত্যহিক ধারণ করেন এক ভুবন বাঙলাদেশ। তিনি গল্পে বয়ান করেন সময়ের নৈর্ব্যক্তিক বোঝাপড়া, বুননে থাকে ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের পলিমাটি, আর এক নির্দয় মায়া। রাজিয়া নাজমী ঘড়ি ধরে ধরে শব্দ গুণে লেখেন না- লেখেন এক অনিবার্য জেরা ও জন্মদানের রোখে। একটিই বই তাঁর : চৌকাঠের বাইরে। রাজিয়া নাজমী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। যুক্তিগ্রাহ্য, আইনসঙ্গত একটি সমাজ দেখার প্রত্যয়ে আইনশাস্ত্রে স্নাতক করে বার কাউন্সিলের সনদ নিয়েছিলেন; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তিবিদ হিসাবে কাজ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি নিউইয়র্ক কেয়ার, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক, এবং বাপা'র সদস্য হিসাবে কাজ করেন। নিউইয়র্কের কুইন্সে ফ্রেন্ডস অব হোলিস লাইব্রেরির ভাইস প্রেসিডেন্ট- এর দায়িত্ব পালন করেন।