বাস্তব্যবিদ্যার যৎ কিঞ্চিৎ : মামুন হুসাইন

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
For deshlai.com
অলংকরন: রাফি আহমেদ চঞ্চল

আমার জন্মের বছর ডিডিটি’র ক্ষতি চিন্তা করে সমুদ্র বিজ্ঞানী র‌্যাচেল কার্সন রচনা করেছিলেন, অবরুদ্ধ (নীরব) বসন্ত, … সাইলেন্ট স্প্রিং। কৈশোর-যৌবন হয়ে এই মধ্য বয়সে সেই ‘অবরুদ্ধ বসন্ত’ অনুবাদের ছলে, অধুনা দৈনন্দিনের নানান দুর্যোগের সঙ্গে বাড়তি একটি ঝুঁকি, ভয়, ও উদ্বেগের আশঙ্কা-বাণী শুনছি লাগাতার… : দু’হাজার কুড়ি সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি দুই ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মধ্যে সীমিত না রাখা যায়, তাহলে মনুষ্য প্রজাতির সমূহ বিপদ! সে-হিসেবে হাতে সর্বসাকুল্যে দু’বছর! কাগজে মনুষ্যজনিত আবহাওয়া পরিবর্তনের নানান ছবি এ’ মুহূর্তে – বনজঙ্গল কাটা পড়ছে, বাতাসে সুপ্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড – মিথেন – নাইট্রাস, পৃথিবী উত্তপ্ত, হিমবাহ গলছে, সমুদ্র জলের অম্লগুণ বৃদ্ধি, সমুদ্রের তাপবৃদ্ধি, শহর-গ্রামের বাধ্যতামূলক সলিল সমাধি, ঘন ঘন ঘুর্ণিবাত্যা, দাবদাহ, বন্যা, খাদ্যাভাব, বিবিধ প্রজাতির মৃত্যু ইত্যাদি সহ আরো সব সুদূরপ্রসারী ভয়ংকর দুর্দশা!

শোষিতের ঐক্যে পৃথিবী ও মানুষের মঙ্গল হবে – এই আপ্তবাক্য মেনে নিয়েই ভাবি, দীর্ঘ এই পথ যাত্রায়, গরীব ক্ষমতাহীন মানুষের বিপদ তো বটেই; কিন্তু জীবন নামক আশির্বাদের আনুকুল্য ক্ষমতাবান দেশ ও ক্ষমতাবান মানুষেরা-ই কী বিশেষ কিছু বাড়তি ভোগ করছে?

ইতিহাসের গোড়ার বই পুস্তকে মানুষের ইতিহাস ছিল – কেবল রাজা বাদশার কেচ্ছা কাহিনী। কালক্রমে বুদ্ধিবাদী মানুষের চোখ বদল হতে হতে, পরিবেশ সচেতন ইতিহাসের আখ্যানে দেখা গেল, মানুষ যেমন বায়োলজিক্যাল এজেন্ট – জৈবিক প্রক্রিয়ার প্রতিনিধি, .. তেমনি মানুষ নিজেই এখন একটি ভূতাত্ত্বিক ক্ষমতা বা জিওলজিক্যাল এজেন্টও বটে : … আন্ত:পারস্পারিক বন্ধুত্বহীন, পরস্পর-সম্পর্করহিত ‘উষ্ণতাহীন মানুষ’, কী বিপুল ঔদাস্যে স্বাধীন-উন্ন্য়ন-প্রকল্পের পাঁকে পৃথিবী পৃষ্ঠের ‘উষ্ণতা বৃদ্ধি’ করে চলেছে নিরন্তর!

অমর্ত্য সেন কথিত ‘ডেভেলপমেন্ট এ্যান্ড ফ্রিডম’ এর সূত্রে এক্ষণে মানুষের এই ক্ষমতালিপ্সু-স্বাধীনতা ও উন্নয়নের ব্যাপ্তি নিয়ে, এই প্রপঞ্চের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিস্তর সেমিনার, তর্ক-ঝগড়াও সম্ভব। দেখবো চিন্তাশীল অনন্তকালের বুদ্ধিবাদী মানুষের জ্ঞান সাধনায়, প্রচারনায় বরাবরই প্রধান অংশ ছিল মনুষ্যকৃত অনাচার, নিবর্তন, অসাম্য এবং এদের মিথস্ক্রিয়ায়-সৃষ্ট জটাজাল থেকে মানুষের মুক্তির উপায় বর্ণনা। কিন্তু ভূ-পৃষ্ঠের মানুষ যে জীবজগতের একটি প্রজাতিও বটে, এই ভাবনাটি সরাসরি আমাদের ইতিহাস-চিন্তাতে কদাচিৎ প্রতিস্থাপিত হয়েছে; ধারণকৃত ইতিহাসের নিরিখে দেখা যায় – মানুষ যখন তার শব্দ ভান্ডারে ‘স্বাধীনতা’ ‘অধিকার’ ‘সার্বভৌমত্ব ও ‘স্বায়ত্বশাসন’ শব্দগুলো সঞ্চয় করতে শিখছে, তখন শুরু হয়েছে মানুষের ফসিল-জ্বালানি ব্যবহারের যুগ – প্রথমে কাঠ, পরে কয়লা, শেষে তেল-গ্যাস। মোটাদাগে বলা যায়, এই ফসিল জ্বালানি ব্যবহারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বহু কথিত ‘মানুষের স্বাধীনতার সৌধমালা’। কিন্তু মানুষের কালচক্র, মানুষের কালান্তর বর্ণনার সময়, বিশিষ্ট ঐতিহাসিকদের প্রণোদনায়, আমরা মনুষ্য প্রজাতির আবহাওয়াগত বা ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাসকে পৃথক বিদ্যায়তনিক জগত বিবেচনা করে এসেছি বরাবর। এই সূত্রে – ‘গ্লোবালাইজেশন’ এর গ্লোব আর ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এর গ্লোব দু’টি পৃথক প্রপঞ্চ। বিশিষ্ট গবেষক সামির আমিন গ্লোবালাইজেশন প্রসঙ্গে ৫টি বৈশিষ্ট চিহ্নিত করেছেন : এটি পুঁজির ভান্ডার, এখানে উন্নত প্রকৌশলগত কারিকুরি বর্তমান, এখানে আছে উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য, প্রচার মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মারণাস্ত্র তৈরির পূর্ণ অধিকার। আলোচনার এই ধারাবাহিকতায় ধনতন্ত্রের সংকট, পুঁজির বিস্ফোরণ, ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি শব্দমালা যুক্ত করে বিশ্বায়ন নিয়ে বাড়তি দু’চার কথা বলার প্রলোভন এড়িয়ে, যে কথাটি বিশেষ ভাবে এই মুহূর্তে ভাবনায় আসে – তা হল পৃথিবীর উষ্ণতা, মনুষ্য প্রজাতির সার্বিক ভবিষৎ ও জলবায়ু সঙ্কট; … যেখানে ধনী-দরিদ্র সবার দায় একরৈখিক। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীনহাউস গ্যাস নিস্ক্রমনের দুই তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে ধণিক শ্রেণীর ভদ্দরলোকদের গালমন্দ করা গেলেও , আমাদের নব্য বাবু শ্রেণীর দায় কম নয়; কারণ, ভোগবাদিতার সূত্রে আমরা যখন ম্যাকডোনালাডাইজেশান’এর অভ্যাস শিখছি প্রতিদিন তখন মনুষ্য নামক প্রজাতির দূর্দশা সৃষ্টিতে আমাদের অবদানও যথেষ্ট দৃশ্যমান।

এর বিপরীতে, প্রকৃতিবাদীদের মোড়কে ‘সবুজ খাদ্য গলধা:করণ’ তথা সরল বেচা-কেনার উস্কানিও এখন যথেষ্ট বেগবান : প্রতিদিন খবরের কাগজের ভাঁজে, পাড়ার হকারকে বশীভূত করে, স্থানীয় কোম্পানি তাদের প্রচার পত্র গোপনে সংযুক্ত করে; লুকিয়ে থাকা সেই পত্রে কোম্পানির ‘অর্গানিক মাংস’ – সমাচার পাঠ করি : …আমাদের ফার্মের জীব-জন্তু, যার পর নাই, মানবিক পরিসরে বাড়-বাড়ন্ত হয়; এরা প্রকৃতিতে স্বাধীন বিচরণ করে। এই প্রমাণ গ্রহণের নিমিত্তে আমাদের ফার্ম ভ্রমণ করুন : হাঁস সাঁতার কাটছে, কখনও পোষা কুকুর নরম ঘাস ছুঁয়ে হাঁসগুলো তাড়া করছে এবং মুহূর্তেই পুকুর জুড়ে হাঁসের মনোরম লুটোপুটি। আমাদের মোরগ-মুরগীও বেজায় সুখি – কেবল সূর্যস্নান এবং বিস্তীর্ণ ঘাস-জমি খুঁটে বেড়ানো। এই জীব-জন্তুই মাংস হয়ে আপনার খাবার টেবিল অবধি পৌঁছয়; … ভূমি বিভাগের সনদপত্র আমাদের সকল কর্মকান্ডের সাক্ষ্য বহন করে – আমাদের চারণভূমি, ঘাস, খড়, শস্য পূর্ণ অর্গানিক ও কেমিক্যালমুক্ত।

যে টি-সার্টটি গায়ে আমরা কথা বলছি, এর তুলো তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ২৭০০ লিটার জল; আর এই সব তুলো উৎপাদনের ফার্মে সেচ দেয়ার জন্য এ্যারাল সমুদ্রের বিপুল জল অজান্তেই উবে গেছে। আবার টি-সার্টে যদি ঘন নীল রং জুড়তে চাই, তাহলে এই রঙীন পৃথিবীতে প্রয়োজন হবে কয়েক তাল ক্রোমিয়াম, ক্লোরিন এবং ফর্মালডিহাইড। ধরা যাক, এবার এই নীল টি সার্ট পরা আপনি একজন চৌকষ লেখক, আপনার প্রকাশক পরিবেশ বান্ধব প্রমাণিত হওয়ার জন্য বলল, আপনার বইটি এবার হবে যথাসম্ভব ‘গ্রীন’ – লোক সকল দেখে ক্লোরিন ব্যবহার না করে পরিবেশ বান্ধব অক্সিজেনেশান পদ্ধতিতে পৃষ্ঠা সাদা করা হল; কিন্তু কালি ব্যবহারের পর রোলার ধোওয়া জল আবারো ছড়িয়ে গেল ভূ-পৃষ্ঠে। নোবেল খ্যাত জোসেফ ষ্টিগলিজ ভোক্তা এবং উৎপাদনকারীদের মধ্যে বিরাজমান এই অসম তথ্য আদান-প্রদানের প্রসঙ্গে  প্রশ্ন তুলেছেন – তথ্যের বৈষম্যই নাকি বাজারকে সক্রিয় রেখেছে!

বাবু-বিলাস বর্ণনার এই ধারাবাহিকতায়, প্রমাণ পাওয়া গেছে, দরিদ্র দেশে এখন এয়ারকন্ডিশনের বাজার উর্দ্ধমুখী; কিন্তু গবেষকদের ভাষ্যে – এতে ব্যবহৃত হাইড্রোফ্লুরো কার্বন তুলনামূলকভাবে বেশী তাপ আটক করে ভূ-পৃষ্ঠে। আবার এয়ারকন্ডিশনের যত্নে যে রাসায়নিক বস্তুটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয় তা যথেষ্ট বিষাক্ত, যা আমাদের কম সচেতন কারিগরেরা হর হামেশা হাতে স্পর্শ করছে কাজের মুহূর্তে এবং তৈরি করছে অবশ্যম্ভাবী এক নতুনতর পেশাগত-স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

ইউএনডিপি’ এর একটি বার্ষিক রিপোর্টে দেখা গেছে – ইউরোপ-আমেরিকা মদ, সিগারেট, আমোদ প্রমোদ, পোষা পশুর খাদ্য, আইসক্রিম, প্রসাধনী, সুগন্ধি ও সামরিক ব্যবস্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করেছে ১৪১১ বিলিয়ন ডলার। এই খরচ ৪০০০ কোটি ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে পৃথিবীর সবাইকে প্রাথমিক শিক্ষা, সুপেয় জল, স্যানিটেশন, নারীর মাতৃমঙ্গল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া যায় মাত্র ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

এই অপচিত উন্নয়ন-যজ্ঞ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি, বিশ্লেষকদের অপর গবেষনায় প্রতিয়মান হয়েছে – মানুষ, হাতি, ঘোড়া, বাঘ-ভালুক, সরিসৃপ, স্তন্যপায়ী ইত্যাদি জীবকুলের বাইরে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বর্তমান ‘মাইক্রোবিয়াল লাইফ’। এক অর্থে ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাল ইত্যাদি মিলিয়ে বেশির ভাগ জীবনই মাইক্রোবিয়াল। আমাদের শরীরের ভেতরে তো বটেই, মাইক্রোব ছাড়া সঠিক গুনাগুন সমৃদ্ধ মাটিও সৃষ্টি হয় না; যেজন্য চাঁদে কেবলই মাটিশূন্য ধুলি। অতি সম্প্রতি অপর এক অমঙ্গলজনক বার্তা এসেছে, জীবনের অন্যতম প্রধান অনুপান অক্সিজেন বিষয়ে : বায়ুমন্ডলের অক্সিজেন-ঘনত্ব, ৬০% সঠিক রাখে ফাইটোপ্লাংটন নামক ছোট ছোট জীব; এখন সমুদ্র-জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হলে, এই সামুদ্রিক জীবের মৃত্যূ হবে ত্বরাম্বিত, যা শেষ পর্যন্ত অক্সিজেন মাত্রাকেই আক্রান্ত করবে। এরপরেও আমরা আমাদের বিপুল-বিবিধ দুরাচার বিষয়ে অনুক্ষণ অনুরক্ত কেন?

বিজ্ঞানীদের মতে – মানব প্রজাতির মস্তিস্কে জন্ম-মুহূর্ত থেকেই এমন একটি নকশা স্থাপিত যা নানান সময়ে আমাদের চারপাশের তাৎক্ষণিক ভয় ও আতঙ্ক চিহ্নিত করে এবং সুরক্ষা দেয়। কিন্তু প্রকৃতি ও জলবায়ুর পরিবর্তনগুলো এত ধীরলয়ে, আর এত অপরিচিত, এত দুষ্প্রমেয় এবং এত দুরধিগম্য যে, মনুষ্যকূলের মস্তিষ্কজাত ভয় নির্ণয়কারী সার্কিট সহজে সেই বিপদ অগ্রীম আন্দাজ করতে পারে না। একই বাস্তবতায়, ভোগ্যপণ্যের সুপ্রচুর উৎপাদনে চতুরপাশে সৃষ্ট নতুন বিপজ্জনক সুমিষ্ট ঘ্রাণের জগতও আমাদের মস্তিকের সমুহ সেন্সরকে, আমাদের বুদ্ধির পরিসরকে, আমাদেরকে, ক্রমাগত বিভ্রান্ত করে চলেছে। এ প্রসঙ্গে ‘ইকোলোজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের’ কথা উঠেছে ইদানিং, যা আমাদের শিখতে হবে নতুন করে – বিজ্ঞানীদের অভিপ্রায় তা-ই।

এঁদের বক্তব্য অনুসারে – দৈনন্দিনের সকল ব্যবহার্য্য সম্পদ – যেমন খাদ্য, খেলনা, গাড়ি, জল, … ইত্যাদি করায়ত্তের মুহূর্ত গুলোতে সজাগ হওয়া চাই : (ক) এই পণ্য ভূমি, বাতাস, জল ও আবহাওয়াকে আক্রান্ত করছে কিনা। (খ) মানুষসহ অন্য প্রজাতির ওপর প্রভাব ফেলছে কিনা। (গ) আর যে মানুষগুলো এর উৎপাদনে জড়িত, তারা আক্রান্ত হচ্ছেন কিনা।

ঝকঝকে, মসৃন যে রেসিং কারটি  শিশুকে উপহার দিচ্ছি, লক্ষ্য করুন, এর রং আরো গভীর এবং দীর্ঘ মেয়াদী করার জন্য আমাদের অজান্তে মেশানো হয়েছে দস্তা : শিশু  রেসিং কারে নিজের স্বপ্ন প্রতিস্থাপন করে, শিশু জননীর মত আঁকড়ে রাখে খেলনাটিকে এবং তক্ষণি ভুলো হয়ে দুধ খাওয়ার জন্য মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে মাকে জানান দেয়; বলতে কী ‘মুখ এবং আঙ্গুল’ স্পর্শের এই চিহ্ন-ভাষা দিনের শেষে অযাচিত ‘দস্তা’ গ্রহণের বিপজ্জনক খেলার প্রতিভাকেই উসকে দেয়। শিশুটি অথবা পরিবারের আর আর সদস্যরা, ধরা যাক, কুলীন ও সম্মোহনী প্রাত:রাশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এবার জ্যাম এবং সস্ এর শিশি খুলছে – কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোলজিষ্ট দেখছেন, এই আপাত: নিরীহ কাঁচের শিশিতে শান্ত সন্ত্রাস বন্টন করছে সিলিকা, কষ্টিক সোডা, লাইমষ্টোনসহ বিবিধ অজৈব রাসায়নিক পদার্থ; যখন এর সফেদ চাউনি প্রস্তুতিতেই ২৪ ঘণ্টা ফার্নেস জ্বলেছে ২০০০ ডিগ্রী তাপমাত্রায়; অপরদিকে  শিশি তৈরির প্রাথমিক উপাদান যজ্ঞ – যেমন শুধুমাত্র কষ্টিকসোডার যোগাড় যন্ত্রেই প্রয়োজন হয়েছে লবন, লাইমষ্টোন, পানি, তরল এ্যামোনিয়া, জ্বালানি বিদ্যুৎ, খনি ইত্যাদি সহ বিপুল এক সাঁজোয়া বাহিনী। অবশেষে কয়েক হাজার যন্ত্রক হয়ে, যন্ত্রগৃহ তথা ‘ইউনিট প্রসেস’ এর ধারাবাহিকতায় এই মনোরম সুডৌল শিশিটি আমাদের প্রাত:রাশ-টেবিলে পৌঁছনোর জন্য তৈরি হল।

গবেষকরা বলছেন – একটি কাঁচের জার তৈরিতে একশ পদের রাসায়নিক বস্তু মাটিতে এবং দুইশত পদের বস্তু বায়ু মন্ডলে প্রবিষ্ট হয়। পাশাপাশি দেখবো, কাগজে তৈরি একটি কাপ তেত্রিশ গ্রাম কাঠ নিশ্চিহ্ন পূর্বক সুপ্রচুর বিদ্যুৎজাত অগ্নিসৎকার শেষে কারখানার বর্জ্য পানিতে যখন ছড়িয়ে দিচ্ছে গুচ্ছের ক্লোরিন, তখন প্লাষ্টিকের একটি কাপ বাতাসে ছড়াচ্ছে পেন্টান, যা অতি সহজেই ওজন ও গ্রীণহাউস গ্যাস উৎপাদনে সহায়ক হচ্ছে মনুষ্যকূলের নুন্যতম শির:পীড়া ব্যতিরেকেই। লক্ষ্য করুন, যে টি-সার্টটি গায়ে আমরা কথা বলছি, এর তুলো তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ২৭০০ লিটার জল; আর এই সব তুলো উৎপাদনের ফার্মে সেচ দেয়ার জন্য এ্যারাল সমুদ্রের বিপুল জল অজান্তেই উবে গেছে। আবার টি-সার্টে যদি ঘন নীল রং জুড়তে চাই, তাহলে এই রঙীন পৃথিবীতে প্রয়োজন হবে কয়েক তাল ক্রোমিয়াম, ক্লোরিন এবং ফর্মালডিহাইড। ধরা যাক, এবার এই নীল টি সার্ট পরা আপনি একজন চৌকষ লেখক, আপনার প্রকাশক পরিবেশ বান্ধব প্রমাণিত হওয়ার জন্য বলল, আপনার বইটি এবার হবে যথাসম্ভব ‘গ্রীন’ – লোক সকল দেখে ক্লোরিন ব্যবহার না করে পরিবেশ বান্ধব অক্সিজেনেশান পদ্ধতিতে পৃষ্ঠা সাদা করা হল; কিন্তু কালি ব্যবহারের পর রোলার ধোওয়া জল আবারো ছড়িয়ে গেল ভূ-পৃষ্ঠে। নোবেল খ্যাত জোসেফ ষ্টিগলিজ ভোক্তা এবং উৎপাদনকারীদের মধ্যে বিরাজমান এই অসম তথ্য আদান-প্রদানের প্রসঙ্গে  প্রশ্ন তুলেছেন – তথ্যের বৈষম্যই নাকি বাজারকে সক্রিয় রেখেছে! বই খুলে তথ্য রাজ্য ঝাড়মুছ করে, বলতে কী এরকম খবরাখবর আরো বিস্তৃত করা নিশ্চয় কোন কঠিন কম্মো নয়; যেমন সমুদ্রের যে শৈল শ্রেণী দেখে সন্তরণবিদেরা মুগ্ধ হচ্ছে, সেই শৈল-শ্রেণী জলে দ্রবিভূত তাদেরই ব্যবহৃত সানস্ক্রিনের কল্যাণে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং এর পরিমাণ অনুমান করা হয়েছে চার হাজার থেকে ছয় হাজার মেট্রিক টন। পক্ষান্তরে রাসায়নিক সার থেকে নি:সৃত নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস দ্রবিভূত হয় জলে এত শৈবাল তৈরি করে যে তা অক্সিজেন কমিয়ে অন্য প্রজাতিকে শ্বাসরুদ্ধ করছে।

কে জানে, হয়ত প্রযুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদের বিপুল নিগড়ে এ সব পাঠ পরিকল্পনা-প্রস্তাবনা নিছক ইউটোপিয়া, নিছক স্বপ্ন দেখা ঘোর! মূল লড়াই, মূল ধন্দ, মূল গলি-ঘোঁজ নিশ্চয় আরো ব্যাপক বিস্তৃত, যা আমরা এক্ষণি খুব সামান্যই স্পর্শ করার ক্ষমতা বহন করি।

বিজ্ঞানীর নোট বইয়ে, দেখা গেছে, স্বাস্থ্যময় গবাদী পশুর বিস্তর বেচা-বিক্রি ত্বরান্বিত করার জন্য লোক পরিসর থেকে বিচ্যুত অধুনা ব্যবহৃত ওষুধ – যেমন এ্যান্টিবায়টিক, উল্টো, এ্যান্টিবায়টিক রোধী ব্যাকটেরিয়ার লাগামছাড়া বংশ বৃদ্ধি ঘটাতে শুরু করেছে। কানাডায়, এর মাঝে একটি ঘটনা জানা যায়: জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির ইষ্ট্রোজেন যে কোন ভাবেই হোক মাটি হয়ে ড্রেন হয়ে লেকের জলে মিশে মিনৌ নামক ক্ষুদ্রাকার মাছের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে; পুরুষ-মিনৌ বড়ির প্রভাবে ডিম্বানু তৈরি করছে, শুক্রানুর পরিবর্তে – এর ফলে ট্রাউট মাছ, যা মিনৌ খেয়ে বাঁচতো তার উৎপাদন এখন যথেষ্ট কম।

মাছ এবং জলের বিপর্যয় পুরাণ আড়াল করে, ধরা যাক, খাবার টেবিলে এক্ষণি একটি প্লাষ্টিক জার দেখছি: লেখা – রিইউজেবল, ফ্রিজেবল ও মাইক্রোওয়েভেবল। কিন্তু এই প্লাষ্টিকের দাঢ্যতা আনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বিপিএ (বিসফেনল-এ), যার গঠন প্রায় ইষ্ট্রোজেন বরাবর। এই ধারাক্রমে অপর এক বিবর্ণন লক্ষ করুন, বিবিসি’তে খবর এসেছিল এরকম : কোকাকোলা প্লান্টের স্লাজ দেয়া হয়েছিল স্থানীয় কৃষকদের, যেন সার হিসেবে তারা জমিতে ব্যবহার করে; দেখা গেল,  এই মিথ্যাচার সমৃদ্ধ সারের বর্জ্যখন্ডের ভেতর লুকিয়ে আছে নানান বিপজ্জনক ধাতব পদার্থ। পরে আদালতের হস্তক্ষেপে এই প্লান্ট বন্ধ করা হয়।

এমনিতর উদাহরন – গল্প-গাছা ইত্যাদি মিলিয়ে, পণ্য উৎপাদকদের এই অসম-তথ্য জ্ঞাপন তথা  ‘অপরিহার্য্য মিথ্যে’ রচনার সৃজনশীলতা আরো ক্লান্তিহীন বর্ণনা করা যায়। বর্ণনা করা যায় – ইউরোপের জাহাজ দ্রুত বোঝাই করণের জন্য নিযুক্ত পাড়াগাঁয়ের বিপদাপন্ন-শ্রমশীল গার্মেন্টস কন্যার সেলাইকলে আঙ্গুল বিসর্জনের নেপথ্য কাহিনী; বর্ণনা করা যায় – আমাদের খাদ্য অপচয়ের কারসাজি, যখন প্রতিনিয়ত লাস্যময়ী সুপারমার্কেট আমাদের কেনাকাটার ‘জিন’ এ প্রবিষ্ট করেছে একটি ঘোরলাগা-উত্তেজক শব্দ ‘বোগফস্’ (bogoffs)  – বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রি … ; বর্ণনা করা যায় শিশুশ্রম অথবা হোচিমিনসিটি – ঢাকা – বোম্বে – এলসালভেদর – ইথিওপিয়া ইত্যাদি দেশে প্রতিষ্ঠিত ‘সোয়েট-শপ’ বিষয়ে। বর্ণনা করা যায় ‘বায়ো ফুয়েল’ তৈরির নামে আঁখচাষীদের বিপদ, শ্রম ও দুর্দশা। বর্ণনা করা যায় – তিমি নিধন এবং বিপন্ন প্রজাতির বিলোপ সাধনায় লিপ্ত মানবজাতির অপরূপ বিভৎস সৃজনশীলতা, অথবা আমাদের বিপন্নতার সন্ধানে পূর্ণ একটি পুস্তিকাই হয়ত রচনা সম্ভব, যেখানে, ধরা যাক, বর্ণিত হল: সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মী, পৃথিবীর বয়স, অর্থনৈতিক অসমবিকাশ, রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ কর্মসূচী, নদী-সংযুক্তি প্রকল্প, বীজরক্ষা আন্দোলন, জিএমও, জিন বৈচিত্র, জৈব রাজনীতি, জৈব-দস্যুতা, জৈব-নৈতিকতা, বিশ্বায়ন, যুদ্ধ, অসহায় বিজ্ঞান ইত্যাদি মিলিয়ে এক সন্ত্রস্ত পৃথিবী, ও এক তৃষ্ণার্ত-ক্রন্দসী গ্রহের জীবন বৃত্তান্ত অথবা এই বর্ণনার জের ধরে তৈরি করা যায় একটি ‘বাংলাদেশ অধ্যায়’, যেখানে বর্ণিত হবে:  গ্যাস ব্লক ইজারা, শেভরন-এশিয়া এনার্জির দলিল, নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ প্রকল্প, তেল-গ্যাস-লুন্ঠন, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ফুলবাড়ি ইত্যাদি মিলিয়ে আমাদের সক্ষমতা, সংকট ও সম্ভাবনার মুখবন্ধ। আমাদের নিরুপায় আত্মা এবেলা আবারও প্রশ্নকাতর হয় – তবে কি পৃথিবী শুধুই মানুষের, এবং শুধুই ঈশ্বর-প্রদত্ত কতৃত্ব প্রদর্শন?

“তারপর ঈশ্বর তাদের (আদম ও ইভ) আশীর্বাদ করলেন এবং ঈশ্বর তাদের বললেন ফলবতী হও, সংখ্যা বৃদ্ধি করো এবং পৃথিবীকে পুষ্ট করো এবং তাকে প্রকাশিত কর এবং কর্তৃত্ব কর সমুদ্রের মৎস্যের ওপর এবং বাতাসের কুক্কুটের ওপর এবং যা কিছু পৃথিবীকে চলমান করে তার ওপর।”

 (জেনেসিস)

বাস্তব্যবিদ্যার নতুন স্বপ্ন দেখা মানুষ এখন তাই জিজ্ঞাস্য হয়েছে আক্রান্ত পরিবেশের ‘স্বচ্ছতা’ বয়ান প্রসঙ্গে : এক কথায় তারা খুঁজছে – রেডিকাল ট্রান্সপারেন্সি: সকল দ্রব্য সকল পণ্যের বৃত্তান্ত ও ঠিকুজি সহ এদের কার্বন ফুট প্রিন্ট সবিস্তারে বর্ণিত থাকবে; বাকি সিদ্ধান্ত নেবে ভোক্তা। দেখছি এ্যাক্টিভিষ্টরা ওয়েবসাইট তৈরি করছেন, যেখানে তথ্য আছে ভোগ্যপণ্য সহ যাবতীয় তৈজস পত্রের, যেন অবাধে এসবের উৎপাদন প্রক্রিয়া, প্রভাব ও সংক্রমণ বিষয়ে মানুষ পূর্ণমাত্রায় অবহিত থাকতে পারে।

ওয়েবসাইট থেকে চোখ সরিয়ে ভেবে ভেবে অনন্তকালের উদ্ভাসিত পরিবেশবিদদের নাম চিহ্নিত করি কাগজে, যদি বা কখনও পড়ার সুযোগ হয় : …  র‌্যাচেল কারসন, জন মুইর লিওপোল্ড, থরো, বন্দনা শিব, সুন্দরলাল, বহুগুণা, আর্নে নেস, … আর রবীন্দ্ররচনাবলীর বনবাণী অংশ।

কে জানে, হয়ত প্রযুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদের বিপুল নিগড়ে এ সব পাঠ পরিকল্পনা-প্রস্তাবনা নিছক ইউটোপিয়া, নিছক স্বপ্ন দেখা ঘোর! মূল লড়াই, মূল ধন্দ, মূল গলি-ঘোঁজ নিশ্চয় আরো ব্যাপক বিস্তৃত, যা আমরা এক্ষণি খুব সামান্যই স্পর্শ করার ক্ষমতা বহন করি। হয়ত এ কথাটিও ভুল, হয়ত আংশিক মিথ্যা ও আংশিক সত্য – মানুষ এই ঘোরতর বিপাকের মধ্য থেকেই নিশ্চয় একদিন হাত বাড়ায়, লড়াকু হয় এবং সৃষ্টি করে একখণ্ড ‘ফুলবাড়ি উপাখ্যান’ অথবা অনেক দূরের “চিপকো আন্দোলন’, যেখানে পাহাড় উপড়ে পাথর-বহন বাধা দিচ্ছে চিপকো কন্যারা – কারণ এই পাথরখণ্ড, তাদের কাছে ধরিত্রী মায়ের মাংসখণ্ড, … ‘আমরা তা পুন:স্থাপন করে ধরিত্রীর ক্ষত নিরাময় করতে চাই।’

এই প্রতিজ্ঞা রক্ষার শপথবাক্য খোঁজার জন্য আমেরিকান-ইন্ডিয়ান ডু ওয়ামিশ উপজাতি প্রধান ‘সিয়োটেল’ এর আশ্চর্য-আলোকিত বক্তৃতা পাঠ করার সুযোগ হয় এবেলা :

অত:পর এইভাবে আমাদের নদী শাসন শেখায়, উন্নিদ্র করে, নিদ্রাবেশ আনে, বিচেষ্ট করে, গোঁফখেজুড়ে করে এবং আমরা দ্রুত রূপান্তরিত হই ‘উন্নয়ন-রিফিউজি’ নামক এক আশ্চর্য বিকাশমান প্রজাতিতে।  

‘এই পৃথিবীর প্রতিটি অংশই পবিত্র। প্রতিটি পাইন সূচিকার উজ্জ্বলতা, সমুদ্রবেলার প্রতিটি বালুকণিকা, গহন অরণ্যের গভীরে কুয়াসা, ঝিল্লির ধ্বনি – সবই আমাদের গোষ্ঠি বা সম্প্রদায়ের স্মৃতিতে পবিত্র। …’

“ আমরা এই পৃথিবীর অংশ এবং পৃথিবীটা আমাদের অংশ। সুগন্ধি ফুল আমাদের বোন, হরিণ, ঘোড়া, মহান ঈগলপাখি এরা আমাদের ভাই। পাথুরে চড়া, তৃণভূমির রস, টাট্টুর দেহের তাপ এবং মানুষ – সবাই এক পরিবারের। এই যে নদীর জল ঝিলমিল করে বয়ে যাচ্ছে, এ শুধু জল নয় , এ আমাদের পূর্বপুরুষের রক্ত।”

“… বেঁচে থাকার আনন্দ কোথায়? যদি না রাত্রির নির্জনতায় হুইপুত্তর উইল’ এর ডাক বা নিশীথে জলায় ভেকের আলাপচারিতা শুনতে না পাই? অথবা পুকুরের জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার মৃদু শব্দ, মেঠো ফুলের সুবাস, দ্বিপ্রহরে বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধ, কিংবা পাইনের গন্ধে মদির বাতাসের আহŸান? …”

‘জল-রক্ত’- এর এই নির্মান, এই কবিতা, পৃথিবী নামক গ্রহের শরীরে এখন নতুন শব্দভান্ডার সঞ্চয় করে :  ইকোলজি/ ডিপ ইকোলজি/ ইকোলজিজম/ এনভায়রনটেলিজম … ইত্যাদি। কখনও ভাবি – তাহলে ‘যুক্তি’ কি? নিজের জন্য একটি কেজো সংজ্ঞা লিখি : এটি বুদ্ধির অতীত আত্মার এক প্রকার এষণা। সোপেনহাওয়ার চেতন জগতে দু’টি কুঠরি খুঁজে পেতে আবিস্কার করেছিলেন : একটি ইচ্ছা এবং অপরটি ধারণা। আমরা কুকুর, বানর, বেড়াল দেখে আনন্দ পাই কেন? তাঁর ভাষ্য – মানুষ এবং জন্তু উভয়ে বেঁচে থাকার তৃষ্ণা ধারণ করে, … তাই; এককথায় ‘উইল টু লিভ -।’ শব্দের কারবারীদের মুখে শুনি ‘এনিমেল’ শব্দ এসেছে ল্যাটিন থেকে – যার অর্থ ‘সোল’ বা … আত্মা। ভাবি ‘আত্মা’ শব্দ খরচ করেই তো সারা পৃথিবীর জ্ঞান ভান্ডার বেঁচে আছে; একেবারে অসচেতন থেকেও দিনের শেষে আমরা আমাদের ভবিষৎ, আমাদের দূর্যোগ, আমাদের আকাঙ্খা ব্যাখ্যা করার নামে নিজের ও জগতের আত্মাকেই হয়ত ব্যবচ্ছেদ করে চলি নিরন্তর। আমাদের মুমুর্ষু নদীর কর্কট রক্ত-জলে অবগাহন করতে করতে মন-হৃদয় ও অন্ত্রের অনুমতি নিই, এই মর্মে যে – ইতোমধ্যে, ধরিত্রী মাতার ঢের ক্ষতির কারণ হয়েছি আমরা। এবার অনুভব করার জ্ঞান খুঁজি : বৃক্ষ, শিলারাশি এবং তৃণলতার কম্পন প্রতিস্থাপন করি হৃদযন্ত্রে। ঘাসের ওপর জমে থাকা জল আমার রক্তস্রোতে মেশানোর জন্য নয়ানজুলি আঁকি। জল হাতে-বুকে এবং মাংসপেশীতে আনন্দ ও যুক্তি ছড়ায়। আমরা হাঁটি অথবা মন হাঁটে নানান পথে। হাতের ওপর জল। পথের এই দিকে সুশৃঙ্খল বাতাস। পথের এই দিকে বিষ্টি, ফুল, বালুকণা, ভেজা বাগান, আকাশ, সবুজ সমুদ্র ও খাদ্যরাশি। পথের স্রোত দ্রুত বদলায় – স্থায়ী হয়ে যায় অস্থায়ী। আকাশ-বায়ু-ধূলিকণা বদলাতে-বদলাতে হয় পৃথিবী অথবা নি:সীম জলরাশি, যখন জল-ই আমাদের ধরিত্রী-মা। বাস্তব্যবিদ্যার ছাত্ররা, এইসব লেখাপড়ায় ক্লান্ত হয়ে…, ধরা যাক, অনেকদিন পর শিক্ষাভ্রমনে বেরিয়েছে :  তারা ‘মুক্তধারা’ নাটকে জলের উৎস বন্ধ করার কাহিনী শেখে, আর বাঁধ ধরে হাঁটে; বাঁধের অবজার্বভেটরি টাওয়ারে উঠে দুরের পাহাড় ঘেরা বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখে – মোটরের স্থানীয় ড্রাইভার বলে : এই জলের নিচে রয়েছে আমাদের শৈশব, আমাদের গ্রাম, আমাদের ভিটেমাটি, আমাদের বাবা-মায়ের সমাধিস্থল, …। আজ সবই জলের তলায়, যে জল দেখছেন, এ সবই আমাদের চোখের জল। ‘উন্নয়ন’ নামক চোখের জল, আমরা বুঝতে শিখি, অত:পর এইভাবে আমাদের নদী শাসন শেখায়, উন্নিদ্র করে, নিদ্রাবেশ আনে, বিচেষ্ট করে, গোঁফখেজুড়ে করে এবং আমরা দ্রুত রূপান্তরিত হই ‘উন্নয়ন-রিফিউজি’ নামক এক আশ্চর্য বিকাশমান প্রজাতিতে।

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
মামুন হুসাইন

মামুন হুসাইন

কথাসাহিত্যিক। ৪ মার্চ ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন কুষ্টিয়া জেলা শহরের কমলাপুরে। পেশায় একজন চিকিৎসাবিদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০১৭ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। প্রকাশিত বইসমূহ: গল্পগ্রন্থ: শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি ১৯৯৫, আমাদের জানা ছিল কিছু ২০০০, মানুষের মৃত্যু হলে ২০০০, বালক বেলার কৌশল ২০০২, নিরুদ্দেশ প্রকল্পের প্রতিভা ২০০২, কয়েকজন সামান্য মানুষ ২০০৩, একটি স্মারক গ্রন্থের জীবন প্রণালী ২০০৫, রাষ্ট্রযন্ত্রের খেলাধূলা ২০০৭, কর্নেল ও কিলিং বিষয়ক এন্ডগেম ২০০৯, যুদ্ধাপরাধ ও ভূমিব্যবস্থার অস্পষ্ট বিজ্ঞাপন ২০১১, অন্ধজনের জাতককথা ২০১৪, সংক্ষিপ্ত সন্ধ্যাভাষা ২০১৬, শব্দান্ধ আত্মার সাধন-বাসনা ২০১৮ উপন্যাস: নিক্রপলিস ২০১১, হাসপাতাল বঙ্গানুবাদ ২০১২, বিষণ্ন হওয়ার ফিল্ড গাইড, শরীর সংক্রান্ত কূটালাপ ২০১৯ প্রবন্ধ: কথা ইশারা ২০১৪, গল্পদেখার চিহ্ন ২০১৬, অসরল পুঁথিবিদ্যা ২০১৯