‘বিমূর্ত প্রটিউস’ : হাসিন এহ্সাস লগ্ন

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

যখন পৃথিবীটাকে বড্ড রিক্ত মনে হয়, হঠাৎ করে শিল্পের সান্নিধ্যও ঘ্যানঘ্যানে লাগে, তখন এক এক জন মানুষ আমাদের জীবনে কোথা থেকে যেন ঠিক চলে আসে, নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ায়, কাঁধে একটা হাত রেখে চারপাশের আশাহীনতা হুশ করে মুছে দেয়—আর আমরা শাশ্বত বন্ধুকে খুঁজে পাই।

দু’হাজার কুড়ি সালটা অনেকের মতো আমারও ভালো কাটছিলোনা একদমই। আর ভালো না কাটার অনেকগুলো কারণও ছিলো। তবু সে বছরটায় আমি পেয়েছিলাম একজনকে, একজন বন্ধুকে।

ডিলান মানেই বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা। যাকে কোনো প্রচলিত ধ্যান-ধারণা দিয়ে মাপা যাবে না। প্রথম থেকেই ডিলান বারবার নিজেকে পাল্টেছেন। শুধুমাত্র তাঁর গায়নশৈলী নয়—চেহারা,স্টাইল, পোশাক-আশাক সবেই ডিলান সতত পরিবর্তনশীল। গ্রিক পুরাণে সমুদ্র দেবতা প্রটিউস শত্রুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ক্রমাগত তাঁর চেহারা পরিবর্তন করতেন। কখনও তিনি ড্রাগন, কখনও সিংহ, কখনও আগুন, কখনও আবার বন্যা। প্রটিউস তাঁর বিভিন্ন রূপে ভবিষ্যৎবাণী করতেন। এরিক ভন শমিডতের কথায় “ডিলান আশ্চর্যজনকভাবে নিজের চেহারা,আকৃতি, দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করতে পারতেন। আজ যদি তিনি হন বড়সড় চেহারার পেশিবহুল যুবক, তবে কালই তিনি বামন, আবার পরের দিনই হয়তো তিনি এক তেরো বছরের বালক৷ তাঁর পরনে সবসময় একই পোশাক—নীল জিন্স আর টুপি। কিন্তু তাঁর নিজেকে পরিবর্তন করার, আলাদা করার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো।”

তাঁর কাছে সম্ভবত পৃথিবীর বড় পুরষ্কারের সবক’টাই আছে। অস্কার, গ্লোন্ডেন গ্লোব, গ্র্যামি, পুলিৎজারের বিশেষ সম্মাননা, লিজিওন অব অনার, আমেরিকার প্রেসিডেনশিয়াল অনার, সবশেষে সাহিত্যের নোবেল।

এক পত্রিকা লিখেছিলো,

“খুব সচেতনে তাঁর জীবনটা এত বিচিত্র বিচিত্র ঘটনা ও ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে কাটিয়েছেন, যে পৃথিবীতে যদি ‘ইন্টারেস্টিং হিউম্যান অ্যাওয়ার্ড’ নামে কোন পুরস্কার থাকতো সেটাও হয়তো তিনিই জিতে নিতেন ৷”

কৈশোর কিংবা প্রথম তারুণ্যের ডিলানকে মনে হবে ‘হোল্ডেন কলফিল্ড’ কিংবা ডিকেন্সের কোনো চরিত্র। তিনি নিজেকে সবসময় ‘শুধু একজন গল্পবলিয়ে’ বলেছেন।

১৯৪১-এর ২৪ মে এক অভিবাসী ইহুদি-আমেরিকান পরিবারে ডিলানের জন্ম। স্কুল পালিয়ে, এলভিসে মুগ্ধ কিশোর কোনো উল্লেখনীয় ঘটনা ছাড়াই পেরিয়ে আসেন বয়ঃসন্ধি। বাডি হোলির শেষতম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে গান শুনলেন ডুলুথ আর্মারি-তে। কেরুয়াক (Jack Kerouac) আর স্যালিঞ্জারে (J.D Salinger) প্রভাবিত হলেন প্রথম কৈশোরে। আবার লিটল রিচার্ড, জিমি রজার্স, হাঙ্ক উইলিয়ামস, রবার্ট জনসনের ক্লজও তাঁকে মাতিয়ে তুলেছিলো। গিটারিস্ট হিসেবে ডিলানের হাতেখড়ি তাঁর হাতেই। বারো বছরের বাবার ট্রাকে কাজ করে কয়েক ডলার দিয়ে কিনে ফেলেছিলেন একটা সিলভারস্টোন গিটার। জন্মস্থান মিনোসোটার প্রতি তাঁর টান সারাজীবনের। রন রসেনবমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,

“খুব ছোটবেলায় আমার আশ্চর্য কিছু পরাদর্শনের অভিজ্ঞতা হয়েছিলো, আর তার এত শক্তি ছিলো যে আজও তা আমায় পথ চলতে সাহায্য করে। সে ছিলো এক বিস্ময়ের অনুভূতি। ব্যক্তিগতভাবে মানুষ হিসেবে যেকোনো রকমের বাস্তবের নির্মাণে বা সৃষ্টিকাজে আমি যা করতে পারি, বলা যায়, সেদিকে তখন আমি প্রসারিত করছিলাম নিজেকে। আমার জন্ম হয় আর কৈশোর কাটে এমন এক অচেনা পরিবেশে, যেখানে একবার গেলে তুমি হয়তো তার ছবি তুলে রাখতে চাইবে। শীতকালের কথা সেসব—দীর্ঘ আটমাসের শীত—সব কিছু স্তব্ধ, চারপাশের পরিবেশ কীরকম যেন অদ্ভুত, অলীক। ঘরের জানলা দিয়ে দৃষ্টিক্ষেপ করা ছাড়া যেন কিছু করার নেই। এ ছাড়া ছিলো স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্ম, যখন কিছুটা গরম পড়লে বাতাস চ্যাটচেটে আর ধাতব হয়ে যেতো। এক ধরনের ভারতীয় উপস্থিতি উপলব্ধি করতাম আমি। সে যেন এ পৃথিবীর বাইরের কোনো জগৎ। গোটা পরিবেশ আকর-সমৃদ্ধ। সব মিলিয়ে, কিছু-একটা ঘটছিলো যা বোঝাতো শক্ত, কিন্তু তার এক অদ্ভুত চুম্বকাকর্ষণ ছিলো। মনে হতো, যেন বহু হাজার বছর আগের কোনো গ্রহ আছড়ে পড়েছিলো এখানে। গোটা মিডওয়েস্টেই এক ধরনের আধ্যাত্মিক চেতনাসমৃদ্ধি ছিলো লক্ষণীয়। খুবই সূক্ষ্ম, কিন্তু শক্ত ছিলো তার ভিত। এ রকম একটা পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা। আর নিউইয়র্ক ছিলো তখন স্বপ্নের মতো।” (অনুবাদ : সন্দীপন ভট্টাচার্য)

জীবনীকার অ্যান্থনি স্কাডুটো ছোটবেলার বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

কৈশোরের বান্ধবী ‘একো হেলস্টর্ম’র (যাকে নিয়ে পরবর্তীতে ‘Girl from the North Country’সহ হয়তো আরও কিছু গান লিখেছেন।) কথাবার্তা থেকে বোঝা যায় স্কুল বরাবরই ডিলানকে (তখন ববি) বিষণ্ণ, বিব্রত, অপ্রস্তুত করতো। তাঁর মতো করে ভাবতো এমন কাউকে তিনি শৈশব-কৈশোরে পাননি।

কান্ট্রিসাইডে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কথা বলবার মতো কেউ ছিলোওনা। একোর সাথে পরিচিত হয়ে কথা বলে দেখেছিলেন সে-ও কান্ট্রি, ব্লুজ অনেক শুনেছে। দু’জনের পছন্দ একই। একোর মা’র কাছে ১৮৭৫ থেকে চল্লিশের দশকের কান্ট্রি আর ব্লুজের সংগ্রহ ছিলো। এসব যে মিনেসোটাতেও আছে সেটা ভেবেই অবাক হয়েছিলেন! তখন থেকে কৈশোরে ডিলানের দুই সঙ্গী—স্টেইনবেক,একো কিংবা তাঁর বাড়ির রেকর্ডসগুলো…সে সময় তাঁর বেশকিছু ব্যান্ড ছিলো,সমবয়সীদের সাথে বাজাতেন। কোনো উৎসবে ব্যান্ড নিয়ে চলে যেতেন আশেপাশের স্টেটগুলোয় বাজাতে। র‍্যাবোঁর মতো ডিলানও চেয়েছিলেন Absolute-কে ছুঁতে। বাড়ি থেকে পালিয়েছেন মোটে সতেরোবার। ১৯৬৪’র নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে কয়েকহাজার দর্শকের সামনে এমনই বলেছিলেন পিট সিগার। হোবো কবি উডি গাথরির জীবনচরিত ‘বাউন্ড ফর গ্লোরি’ হিবিংয়ের সেই গ্রাম্য ছেলেটির দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। পরবর্তী জীবনে কোনোরকম গণ্ডির মধ্যে যে আবদ্ধ থাকতে অস্বীকার করে, এবং প্রায় প্রতিমুহূর্তে নিজেকে বদলে ফেলার সাহস দেখায়। মধ্যবিত্ত কিংবা ইহুদি পিছুটান, এ সবকিছুকে পেছনে ফেলে সে একদিন হাজির হয় নিউইয়র্ক শহরে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবন, তাঁর গান। বব ডিলানের গান।

হাওয়ার্ড সাউন্স তাঁর বই Down the highway: The life of Bob Dylan-এ লিখেছেন, “১৯ বছর বয়সী ডিলান দুই বন্ধুর সাথে গাড়ি চালিয়ে উইস্কনসিন থেকে নিউইয়র্ক শহরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান ‘৬১র মধ্য জানুয়ারিতে, নিউইয়র্কে এসে পৌঁছান ২৪ তারিখ।” তাঁর দুটো সাক্ষাৎ পরিকল্পনা ছিলো।

এক. উডি গাথরির সাথে দেখা করা আর

দুই. গ্রিনিচের ক্রমঃজনপ্রিয়মান কফিহাউসগুলোতে গান করা।

“ ‘৬১র জানুয়ারির ২৪ তারিখ বা তার কাছাকাছি, গ্রিনিচে ওঁর প্রথম রাত্তিরটাতে, বব একটা ক্যাফেতে চলে গিয়েছিল সম্ভবত, ম্যাকডাওয়েল স্ট্রিটের একটা ক্যাফেতে।” সাউন্স লিখছেন, “সে রাতটায় ছিলো লোকগানের আসর, মাইক চালু আছে, যেকেউ চাইলে উঠছে, গান করছে…

“আমি সারাটা দেশ ঘুরে চলেছি”, বব দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললো, “উডি গাথরির পদাঙ্ক ধরে।”

ডিলান কোন এক অজানা কারনে নিজের শৈশব লুকোতে চাইতেন৷ তাঁর এই শৈশব লুকোনোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো নিজের পরিবার প্রদত্ত নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে৷

ডিলানের পারিবারিক নাম ছিলো রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান৷ মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বব ডিলান নামে তিনি স্থানীয় ক্যাফেগুলোতে গান গাইতে শুরু করেন৷ নিউইয়র্কে এসে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের পুরোনো নাম বাদ দিয়ে পাকাপাকি ভাবে নিজের নাম বব ডিলান রেখে দেন৷

কেউ কেউ ধারনা করেন ওয়েলশ কবি ডিলান থমাসের প্রতি মুগ্ধতায় নিজের নাম বব ডিলান রেখেছিলেন তিনি৷ যদিও তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “যারা বিছানায় অতৃপ্ত, তারাই কেবল ডিলান থমাসের কবিতা ভালবাসতে পারে৷”

এ নিয়ে আত্মজীবনী ক্রনিকলসে বিস্তারিত বলেছেন তিনি।

ডিলান থাকতে শুরু করেন গ্রিনিচের (Greenwich) ম্যাকেঞ্জি পরিবারে,প্রতিরাতে পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে। পিটার ম্যাকেঞ্জির ‘50 Cents a Day’ বইতে সেসময়ের ডিলানের চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। নিউ ইয়র্কের গ্রিনিচ ভিলেজ আজ থেকে একশো বছর আগে থেকেই শিল্পীদের বিচরণভূমি, তাঁদের স্বর্গ, তাঁদের ‘free and independent republic’, যেখানে মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা, যেখানে নতুনের নির্ভয় জয়গান। ছয়ের দশকেই গ্রিনিচ ভিলেজ সম্ভবত উত্কর্ষের উচ্চতম বিন্দু ছুঁয়েছিল, যে-‘গ্রাম’-এ কবিতা, চিত্রকলা, নাটক এবং অবশ্যই সংগীত খুঁজে পেয়েছিল অনন্ত সম্ভাবনাময় অলিগলি। এবং সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে সব কিছুই ‘শিল্পিত’। গ্রিনিচ ভিলেজে আর্ট ‘reigned supreme’! এই জীবনধারার খোঁজ আমাদের সেই ছয়ের দশকেই দিয়েছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘বীটবংশ ও গ্রীনিচ গ্রাম’ (১৯৬১) প্রবন্ধে তুলে এনেছেন জায়গাটির আত্মা— ‘‘ন্যুয়র্কের তারকাচিহ্নিত দ্রষ্টব্যের মধ্যে এও একটি—এই ‘গ্রাম’; কেননা ‘দি ভিলেজ’ মানেই বোহেমিয়া, প্যারিসের ‘বাম তীরে’র ইয়াঙ্কি প্রকরণ, কেননা জীবন এখানে প্রথামুক্ত, আচরণ স্বচ্ছন্দ ও স্বাধীন, বেশবাস আলুথালু, শ্বেত-কৃষ্ণ বা ধনী-দরিদ্রে ভেদ নেই, শিল্পকলার মর্যাদা স্বপ্রকাশ; এখানে ছত্রিশ জাত একই টেবিলে কালো কফি বা নিছক ভডকা পান ক’রে‌‌‌‌‌‌‌‌‌ থাকে, আর ঘড়িতে রাত এলিয়ে পড়লেও কাফের দরজা বন্ধ হ’‌য়ে যায় না।’’

ডিলানের চোখে: ‘Down in the Village nothing seemed wrong. Life was not complex. Everybody was looking for openings.

নিউইয়র্ক প্রসঙ্গে রন রসেনবমকে বলেছেন,

“সে ছিলো এক সর্বজাগতিক, নাগরিক চেতনায় সমৃদ্ধ মনের স্বপ্ন। আমার পক্ষে শেখার, আর একই পথে সহযাত্রী কিছু মানুষের সঙ্গলাভের জন্য সে ছিলো এক অসাধারণ জায়গা। …ঐ খাঁটি ছয়ের দশকের গোড়ায় শেষ কিছু গোল্লাছুট মানুষের দল আকর্ষিত হয় নিউইয়র্কের দিকে। সেই আঠারোশো সাল থেকেই তো লোকে নিউইয়র্কে আসছে। আমার কাছে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটা অসাধারণ। একটা ক্যাফে ছিলো, কী যেন তার নাম, ভুলে যাচ্ছি, আসলে সেটা ছিলো আয়রন বারের সুসজ্জিত পুরোনো একটা আস্তাবল। ঐরকম এক অঞ্চলে থাকার অভিজ্ঞতাটাই তো আলোকপ্রাপ্তির মতো। আমার মনে হয় তারপরে আর বিশেষ কিছু নিউইয়র্কে হয়নি। এই গণযোগ-ব্যবস্থাটাই শেষ করলো তাকে। গোটা শহরটাই তখন এক অতিকায় উৎসব-মুখরতার চেহারা নেয়। গোড়ার দিকের সে-কথা বুঝতে পেরে আমি সেখান থেকে পালাই। বিযুক্তি আর সৃষ্টির পরিবেশ একদা যে শহরের বৈশিষ্ট্য ছিলো, ক্রমশ তা হয়ে ওঠে দেখনদারি নানা অনুষ্ঠানের জায়গা, আর লোকেরও মনোযোগ সেদিকেই ঘুরে যায়।” (অনুবাদ : সন্দীপন ভট্টাচার্য)

ডিলান তখন বার-টারে গান শুধু। এক ডলারের বিনিময়ে ক্যাফেতে চারঘন্টা হারমোনিকা বাজান।

৬১’র এক সন্ধ্যায় সাইপ্রাস গাছের নিচে পরিচয় হলো টেক্সান সিঙ্গার ক্যারোলিন হেস্টারের সাথে। ক্যারোলিন লিখেছিলেন, “…তখন ওঁকে দেখে মনে হচ্ছিল ডিকেন্সের কোনো উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে!”

কথাবার্তা হলো, কিছুদিন আগে উডি গাথরির সাথে দেখা করতে যাবার কথা জানালেন।

তাঁর তখন মনে হতো রিচার্ড ফারিনা (Richard George Fariña, American folksinger-songwriter-poet and novelist) পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ, ক্যারোলিনকে পেয়েছে। ক্যারোলিনের প্রথম অ্যালবামে হারমোনিকা বাজিয়েছিলেন তাঁর বাবা। কোরাল রেকর্ডস থেকে বেরোনো দ্বিতীয় অ্যালবামের জন্যও ক্যারোলিন চাইছিলেন হারমোনিকা থাকুক ইস্ট্রুমেন্ট হিসেবে। তার জন্য ডিলানকে একটু হেল্প করতে বলেছিলেন হারমোনিকা বাজিয়ে।

ওখানে রেকর্ডিংয়ের সময় টুকটাক গানও গাইতে হয়েছিলো। তখন কিংবদন্তি প্রোডিউসার John Hammond শুনলেন তাঁর গান। আর একেবারে কলম্বিয়ায় সাইন করার জন্য অফার করে দিলেন!

কেউ চেনেনা জানেনা, বারে গান গায়…এমন একজনকে একেবারে কলম্বিয়ার জন্য…!

তখন ফোক সিঙ্গারদের নিয়ে রিভিউ লিখতো  পত্রিকাগুলোয়। ডিলানকে নিয়ে কোথাও তেমন কিছু লেখা হতোনা। অন্য সবার সাথে ওঁর নাম লিখতো, আলাদাভাবে কিছু না।

স্বাভাবিকভাবে কলম্বিয়ার জন্য অফার করার কথাটা শুনে তাঁর “হার্ট একলাফে গ্যালাক্সির নক্ষত্রপুঞ্জের কাছে চলে গিয়েছিলো!”

কলম্বিয়া রেকর্ডসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবার সময় তাঁর বয়স ছিলো মাত্র বিশ বছর। তরুণদের সাথে অফিশিয়াল চুক্তিপত্রে যেতে হলে রেকর্ড কোম্পানিটি অভিভাবক স্বাক্ষর সংক্রান্ত নিয়ম জারি রেখেছিল। ডিলান রেকর্ড কোম্পানিকে জানিয়েছিলেন ছোটবেলায় তিনি তাঁর বাবা-মাকে হারিয়েছেন। তাঁকে ঘিরে বন্ধুবান্ধব সমাজে নিজেই একগাদা আজগুবি তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ঐ সময়কার সমস্ত বন্ধুবান্ধবরা জানতো তাদের অনাথ বন্ধুটি একটি সার্কাস কোম্পানিতে ছোট থেকে বড় হয়েছে। যদিও তাঁর কিছুদিন পরেই ‘নিউজউইক’ পত্রিকা তাঁর সমস্ত সিক্রেট ফাঁস করে দিয়েছিলো।

ক্যারোলিন হেস্টার স্যুজি রোটোলোকে ডিলানের ‘মিউজ’ সম্বোধন করেছেন। লিখেছেন,

“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, স্যুজির সাথে দেখা হবার কারণে তাঁর অন্তত দু’বেলা খাবারের একটা ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিলো!”।

স্যুজি মিনেসোটা থেকে কেবল নিউইয়র্কে এসে, নিউইয়র্কের চাকচিক্যে হতভম্ব এলোমেলো ছেলেটার হাত ধরে একটু একটু করে নিজের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন…ফ্রেঞ্চ সিম্বলিস্টদের সাথে পরিচয় করান, নিজের জনরার বাইরে পড়তে শেখান, দু’জনে থিয়েটার-পেইন্টিংয়ের সৌন্দর্যে ভেসে যেতে থাকেন…

এদিক থেকে বিভূতিভূষণের ‘অপু’ আর ডিলানের মধ্যে মিল খুঁজে পাই।

অপুর মতো ডিলানও প্রথম নিউইয়র্কে এসে রাত প্রতি পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে থাকা বাড়িটা সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিসপত্রে ভর্তি করে ফ্যালে…ইচ্ছে ছিলো নিজের মতো করে সাজানো একটা রুম হবে, বুকশেল্ফ থাকবে ‘হার্ডকভার’ বইতে ভর্তি, প্রচুর রেকর্ডস থাকবে…অতঃপর রাত প্রতি পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে থাকবার বন্দোবস্ত করে ফেলা…

শহরে অপুর হয় লীলা, ডিলানের স্যুজি। প্রথমে দু’জনেই গেঁয়ো। ধীরে ধীরে শহরের সাথে খাপ খাওয়ায়। অনেকটাই লীলা/স্যুজির হাত ধরে…

স্যুজি ছিলেন সোশ্যালিস্ট। একদিন তাঁকে নিয়ে কোনো এক সোশ্যালিস্ট পার্টির অফিসটাইপ জায়গার সামনে হাঁটছিলেন,কথা বলছিলেন…হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “No one is free, even the birds are chained to the sky” স্যুজিকে হারানোর পর লাইনটার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন একটু অন্যভাবে।

“Ah, my friends from the prison, they ask unto me
How good, how good does it feel to be free?
And I answer them most mysteriously
‘Are birds free from the chains of the skyway?’ ”

৬১’তে স্যুজি ইতালি যাবার পর চিঠিতে লেখেন, “Nothing much is happening here I guess. Bob Shelton is waiting for Jean, the dogs are waiting to go out, the thiefs are waiting for an old lady. Little kids are waiting for school, the cop is waiting to beat up on someone, them lousey bums are waiting for money. Grove Street is waiting for Bedford Street, the dirty are waiting to be cleaned. Everybody is waiting for cooler weather, and I am just waiting for you…”

কলম্বিয়ার রেকর্ডিং সেশনে স্যুজি ডিলানের সাথে ছিলেন। স্যুজির রোটোলোর এক অসাধারণ বই আছে “A Freewheelin’ Time: A Memoir of Greenwich Village in the Sixties”. স্যুজির মা ম্যারি রোটোলো ছিলেন প্রগতিশীল লেখিকা, সোশ্যালিস্ট। এর’ম এলোমেলো, ভবঘুরে একজনকে কখনোই মেয়ের সাথে দেখতে চাননি। একরকম পারিবারিক কারণেই তাঁরা আলাদা হয়ে যান। যদিও শেষপর্যন্ত নিজেদের ভালোবেসেছেন…

এই চারবছরে বেরোয় ডিলানের স্টুডিও অ্যালবাম—Bob Dylan, The Freewheelin’ Bob Dylan, The Times They’re a-Changin’, Another Side of Bob Dylan. প্রথম অ্যালবাম ফ্লপ, সেখানে ডিলানের নিজের লেখা দু’টি গান—‘টকিং নিউইয়র্ক’ আর সং টু উডি’ ছাড়া সবগুলোই ছিলো ট্র্যাডিশনাল ফোকের কভার। বাকি তিনটি অ্যালবামের প্রত্যেকটাই ব্লকবাস্টার। তাঁর সেরা প্রোটেস্ট সংগুলো এসব অ্যালবামের। ‘The Freewheelin’ Bob Dylan’ অ্যালবামের সাফল্যের পর আমেরিকার হাইয়েস্ট রেটেড ভ্যারাইটি শো এড সালিভানে পারফর্ম করার জন্য নিমন্ত্রিত হন। সেখানে তিনি ‘Talking John Birch Paranoid Blues/Talking John Birch Society Blues’ শীর্ষক গান পরিবেশন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পলিটিক্যাল স্যাটায়ার, আর অ্যান্টি-কম্যুনিস্টদের ব্যঙ্গ করায় এ গান পরিবেশন করতে নিষেধাজ্ঞা আসে। তিনি তাদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এড সালিভান মামলাও ঠুকে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন ডিলানের কোর্টের সাথে লড়ার মতো ফ্যানবেইজ, সামর্থ্য কিছুই ছিলোনা। অন্যরা তাঁকে বারবার বলছিলেন এসবের থেকে বেরিয়ে আসতে। অগত্যা তিনি আর সামনে এগোননি। তবে এরপর আর কোনোদিন টেলিভিশনে পারফর্ম করেননি।

এরপর ডিলানের ইলেকট্রিক পিরিয়ড। এখানে আমরা দেখতে পাবো সবচেয়ে আয়রনি, রাফ-টাফ ডিলানকে। ডিলানের জীবনের সবচেয়ে বড় কনট্রোভার্সিটা হয়েছে তাঁর ইলেকট্রিক গিটার হাতে ফোক ফেস্টিভ্যালের মঞ্চে ওঠা নিয়ে। ’৬৫র জুলাইয়ের চব্বিশ তারিখ শনিবার তিনি নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে তাঁর তিনটি অ্যাকুস্টিক গান পরিবেশন করেন—‘All I Really Wanna Do’, ‘If You Gotta Go, Go Now’ আর ‘Love Minus Zero/No Limit’. সবাই তাঁকে একজন অ্যাকুস্টিক লোকগায়ক হিসেবেই নিয়েছিলো। পঁচিশ জুলাই রবিবার রাতে ইলেকট্রিক গিটারের সাথে তাঁকে দেখে অডিয়েন্সদের ইম্প্রেশন ছিলো ভয়াবহ। কেউ কেউ তো পারলে মঞ্চ থেকেই নামিয়ে দেয় এমন অবস্থা৷ একজন ‘জুডাস’ বলে গালি ছুঁড়ে দিলো। ডিলান সেসব যেন দেখেও দেখছেন না৷ এ’দিন ডিলান ইলেকট্রিক গিটারে বেশকিছু গান পরিবেশন করেন, ’৬৫-৬৬তে ইলেকট্রিক ট্যুর করেন। ডিলানের ইলেকট্রিক ফিগার নিয়ে তৈরী হয়েছে ডকুমেন্টরি-সিনেমা, লেখা হয়েছে বই। সম্প্রতি টিমোথি শালামে অভিনীত ‘Going Electric’ মুক্তির অপেক্ষায়। ডিলানের প্রথম ইলেকট্রিক গিটার হাতে পারফর্মেন্সের ক্লিপগুলো সংরক্ষিত আছে Festival (1967), No Direction Home (2005), The Other Side of the Mirror: Bob Dylan Live at the Newport Folk Festival 1963–1965 (2007) ডকুমেন্টরিগুলোয়। এসময় ডিলান ব্যক্তিগতভাবেও বিভ্রান্ত, বিধ্বস্ত ছিলেন। ডিলান-জোন বায়েজের বন্ধুত্বের কথা অনেকেরই জানা। এঁরা একজন আরেকজনকে ছাড়া যেন অপূর্ণ।

দু’জনেরই গাইতে যেতে হবে, ডিলান একেবারেই প্রস্তুত নন। জোন ব্রাশ-স্নান করিয়ে, চুল আঁচড়ে, জামা-কাপড় তৈরি করে দিতে দিতে নিজের শো’র জন্য দেরী করে ফেলবেন! জোনের স্যুটকেস বিভিন্ন মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ভর্তি। তারমধ্যে ডিলানের জন্য বাড়তি দু’একটা টি-শার্ট, স্যুট-ফ্যুট রাখার জন্য ভারী। ওয়াইন খেয়ে বমি-টমি করে ফেললে বিকল্প হিসেবে লাগবে!

তাঁরা বেশিদিন একসাথে থাকেননি। কিছু পরেই ডিলান সারা লোন্ডসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ৷ সারার জন্য একের পর এক প্রেমের গান লিখতে থাকেন, জোনকে দিয়ে রেকর্ড করান। জোন প্রথমে তাঁর জন্য ভেবে খুশি হন, পরে বোঝেন। Anthony Scaduto’র ইন্টারভিউতে ডিলানকে প্রথম দেখার মুহূর্তের কথা বলেছেন। ডিলানের চোখের দিকে তাকিয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে অস্ফুটে বলেছিলেন, “Beautiful কিংবা Oh God”! আর ডিল বিড়বিড় করেছিলেন, “Hey…Hey…That’s too much!” প্রেম ভাঙার পর লিখেছেন, “As I remember your eyes were bluer than Robin’s egg…”

‘ববি’কে না পাবার আক্ষেপ তাঁর সবসময়ের। ডেভিডকে বিয়ের পর একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, “ডেভিড ‘মানুষ’ হিসেবে দারুণ। আগেরজন তো ‘মানুষ’ ছিলো না,ছিলো ‘ক্যারিশমা’! সের’ম আর কাউকে নিশ্চয়ই পাবেননা, সুতরাং ডেভিড ভালোই, মানুষ যেহেতু…” অ্যান্থনিকেই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের কথা বলেছেন। “Once he bought me a beautiful coat, a blue-green corduroy thing. I wore it with a silk scarf. And I bought him a black jacket, and some weird lavender cufflinks, and a white shirt. I remember it was winter then, and we were staying at the Earle in the village. We were leaning out the window one morning and watching the kids. I felt as if I’d been with Bobby for a hundred years, and all those kids wondering around out there were our own children, you know? This couple looked up and I knew they recognised us. They were beautiful…”

ডিলানকে রন রসেনবম বলেছিলেন,

“মনে পড়ছে, জোন বায়েজের প্রথম দিকের এক অ্যালবামের মলাটে তুমি একটা কবিতা লিখেছিলে। সেখানে তুমি বলেছিলে যে, চিরকালই তোমার মনে হয় সুন্দর হিসেবে কোনো জিনিস ধরা দেয়ার আগে তার কুৎসিৎ হওয়াটা খুব জরুরি। ঐ কবিতার অন্যত্র অবশ্য বলেছিলে যে, জোন বায়েজের গান শুনেই তুমি বুঝতে পারো যে সুন্দর হওয়ার জন্য কোনো জিনিসের আবশ্যিকভাবে কুৎসিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।”

ডিলান বলেন, “সে-সময়ে আমি জোন বায়েজে বিভোর (নীরবতা) আর আমার ধারণা আমি তখন শুধু নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে না, মোটেই বিভোর নই!” (অনুবাদ : সন্দীপন ভট্টাচার্য)

‘To Ramona’য় তাঁর প্রতি ববির আর্তি, ‘Diamond & Rust’এ ববির প্রতি তাঁর। এ-ও বা অমরত্বের চেয়ে কম কিসে?

সারা লোন্ডস ছাড়াও সেসময় সুপারমডেল এডি সেজউইকের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তাঁকে নিয়ে ‘Blonde on Blonde’ অ্যালবামের প্রায় সবক’টা, আর ‘Positively Fourth Street’, ‘Like a Rolling Stone’ গানদু’টো লেখা।

…এইসব ডিপ্রেশন-ফ্রাস্টেশন থেকে দূরে যেতে সবসময় থাকতেন ওয়াইনে বুঁদ হয়ে। সেসময়ের লাইভ পারফর্মেন্স কিংবা ক্লিপগুলোর কোত্থাওই তাঁকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়না।

১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে উডস্টকে সিরিয়াস এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন ডিলান। এই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ দুই বছর পর্যন্ত তিনি জনসম্মুখে আসেননি। ঐ সময়টাকেই তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী ডিলান পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সারাদিনই ব্লুজ, রক, কান্ট্রি সংগীতে মেতে থাকতেন। তাঁর লিরিকেও নিরীক্ষামূলক অনেক কিছুর সংযোজন ঘটেছিলো সেই সময়টাতে। নতুন-পুরনো মিলিয়ে একশোরও বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন তিনি।

তবে এই দুর্ঘটনা নিয়েও অনেক কন্সপিরেসি থিওরি আছে। কেউ কেউ মনে করেন লাগাতার শো, অ্যালবামের চক্র থেকে বিরতি নিতেই ডিলান দুর্ঘটনার কাহিনী ফেঁদেছিলেন। পরবর্তীতে তার আত্মজীবনীতে এই দুর্ঘটনার সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছিলেন—“ইন্ডাস্ট্রির ইঁদুর দৌঁড় থেকে বের হবার জন্য দুর্ঘটনা-পরবর্তী বিরতির সময়টুকু তাকে দারুণ সাহায্য করেছে।”

’৭১র পহেলা আগস্ট ডিলান পারফর্মেন্স করেছেন কনসার্ট ফর বাংলাদেশে। সেখানে গেয়েছিলেন ‘A Hard Rain’s A-Gonna Fall’, ‘Blowin’ in the Wind’, ‘It Takes a Lot to Laugh, It Takes a Train to Cry’, ‘Love Minus Zero/No Limit’ and ‘Just Like a Woman’,‘Mr. Tambourine Man’র মতো গানগুলো। https://www.dailymotion.com/video/x55yz4o

ডিলান বাংলায় এসেছেন সত্তরের দশকে, পূর্ণদাস বাউলের হাত ধরে। পূর্ণদাস ডিলানের দু’টো গানের ভাবানুবাদ ক’রে নিজের মতো সুর বসিয়েছেন। তাঁরা খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। পূর্ণদাস আর ডিলান আমেরিকায় বেশক’টি কনসার্ট করেছেন একসাথে। খিচুড়ি ডিলানের খুব প্রিয় খাবার। আমেরিকায় পূর্ণদাসের অ্যাপার্টমেন্টে হুট করে মাঝেমাঝেই হাজির হতেন, পূর্ণর স্ত্রী মঞ্জুর হাতের খিচুড়ি খেতে চাইতেন। খিচুড়ি ছিলো তাঁর বিশেষ প্রিয়। আমরা ডিলানের ‘John Wesley Harding’ অ্যালবামের কভারে পূর্ণদাস আর তাঁর ভাই লক্ষ্মণদাস বাউলকে দেখতে পাই। পূর্ণদাস জানিয়েছেন,

“তুমি হলে ভাই ইন্ডিয়ার বাউল, আমি আমেরিকার বাউল। আমি মানুষকে নিয়ে গান করি, বাউলরাও তাই। তারাও মানুষকে নিয়েই গান করে। তারাও মানুষকে ভালবাসে, আমিও মানুষকে ভালবাসি। গান দিয়ে যতটা পেরেছি, তাদের সেবা করেছি। ভবিষ্যতেও করব। লেখা যা লিখেছি, তার প্রেরণাও সেই মানুষ। তাকে বাঁচানোই আমার উদ্দেশ্য।

গোলাগুলি, হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ…দিনের পর দিন মানুষকে অন্যায়ভাবে অকালে ধ্বংস করে ফেলা, এতো প্রকৃত মানুষের কাজ নয়। মানুষকে যত ভালবাসতে পারবে, আপন করতে পারবে, ততই তোমার মানবিকতা প্রকাশ পাবে। আর মানবিকতা প্রকাশ করতে গেলে তোমাকে মানুষের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, তাদের সাথে মিলে যেতে হবে, ভালবাসতে হবে। আমিও সবার সঙ্গে মিশতাম, সবার সাথে বসতাম, আপন পর আলাদা করে ভাবিনি কোনওদিন। রেস্টুরেন্টে যখন গান গাইতাম, লিখতাম, তখন বহু মানুষের সান্নিধ্য পেতাম। কিন্তু কোনওদিন আপন পর বলে বাছবিচার করতাম না। তোমরা বাউলরা যেমন সবাইকে নিজের আপন বলে মনে করো, আমিও তাই। আমার লক্ষ্য শুধু একটাই— প্রেম, প্রীতি ও ভালবাসা। আমার গানের মধ্যে দিয়ে, লেখার মধ্যে দিয়ে এইকথাই আমি বারবার সবার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি। তাদের বলতে চেয়েছি… মানুষকে ভালবাসতে শেখো।”

পরে কবীর সুমন, অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা, শ্রীজাত থেকে অনুপম রায় পর্যন্ত ডিলানকে দিয়ে অনুপ্রাণিত। কবীর সুমন তো সরাসরি অনুবাদই করেছেন। এক সমালোচক লিখেছিলেন ‘সুমনের ডিলানভাঙা গানের সংখ্যা ক্যালকুলেইট করতে গেলে আঙুলে কুলিয়ে ওঠা যাবেনা আমরা জানি’। ডিলানকে নিয়ে কবি সুবোধ সরকারের একটি দারুণ কবিতা আছে।

https://youtu.be/LSxF_s4LfWE

ডিলানের সাথে কলকাতার একাত্মতা নিয়ে তৈরী হয়েছে ডকুমেন্টরি ‘If not for You’

https://vimeo.com/338406342

ডিলান একজন কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর… সব ছাপিয়ে একজন দার্শনিক। খুব বড় মানের পাঠক। বিভিন্ন ইন্টারভিউতে ডিলানকে তাঁর প্রিয় লেখক-কবিদের কথা বলতে হয়েছে। পুরোনো ইন্টারভিউগুলোর খুব সাধারণ প্রশ্ন ছিলো ‘তুমি এখন কী পড়ছো?’ এতে তিনি বেশ বিরক্ত হতেন। একবার এক ইন্টারভিউয়ার ঘুরিয়ে বলেছিলেন ‘ডিলান এখন কী পড়ছে জানো?’

ফ্রান্সিস ভিলন, চেখভ, ব্রেখট, দস্তয়েভস্কি,  টলস্টয়, জোসেফ কনরাড, হারমান মেলভিল, জেমস জয়েস, হেনরি মিলার, জন স্টেইনবেক, জন কীটস্, লর্ড বায়রন,

জন ডান, শেলী, উইলিয়াম ব্লেক, আর্তুর র‍্যাবোঁ, রিলকে, অ্যালেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক, গ্রেগরি করসো, শেক্সপিয়ার, হেনরি টিমরোড,

কার্ল ভন ক্লজউইৎজ, বালজাক, এরিক মারিয়া রেমার্কদের কথা প্রায় সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বলেছেন।

তিনি এনশিয়েন্টদের দিয়ে বিশেষ প্রভাবিত। ‘Why Dylan Matters’ বইতে লেখক রিচার্ড এফ. থমাস- ক্যাটালাস, ওভিড, স্যাফো, এস্কাইলাস, ভার্জিল, ট্যাসিটাস, থুকিডাইডস্, হোমার, স্যাফোর সাথে ডিলানের গান মিলিয়ে দেখিয়েছেন।

ডিলান মানে শুধু ‘ব্লোয়িন’ ইন দি উইন্ড’ বা ‘লাইক এ রোলিং স্টোন’ নয়, কবি হিসেবে ডিলানের উচ্চতা ছুঁতে চাইলে

‘Vision of Johanna’
‘Desolation Row’
‘Stuck Inside of Mobile with the Memphis Blues Again’
‘Gates of Eden’
‘Chimes of Freedom’
‘It’s Alright Ma (I’m Only Bleeding)’
‘Sad Eyed Lady of the Lowlands’
‘Love Minus Zero/No Limit’
‘Mr. Tambourine Man’
‘Shelter from the Storm’
‘Ballad of a Thin Man’
‘Abandoned Love’
‘Eternal Circle’…’র মতো গানগুলো শুনতে হবে।

ডিলানের স্টুডিও অ্যালবামের সংখ্যা ৩৯টি। এরমধ্যে ‘Blonde on Blonde’, ‘Blood on the Tracks’, ‘Nashville Skyline, ‘Bringing It All Back Home’, ‘Highway 61 Revisited’ আমার বিশেষ পছন্দের। ডিলানকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক ডকুমেন্টরি/সিনেমা। তাদের মধ্যে কিছু হলো—

Don’t Look Back (1967)
Eat the Document (1972)
No Direction Home : Martin Scorsese (2005)
65 Revisited (2007)
Trouble No More: A Musical Film (2017)
Rolling Thunder Revue: A Bob Dylan Story by Martin Scorsese (2019)
Odds and Ends (2021)

ডিলান নিজেও পরিচালক এবং অভিনেতা। তাঁর অভিনীত কিছু সিনেমা হলো—
BBC Sunday-Night Play: The Madhouse on Castle Street (1963) (partial audio only, film lost)
Pat Garrett & Billy the Kid (1973)
Renaldo and Clara (1978)
Hearts of Fire (1987)
Backtrack a.k.a. Catchfire (1990)
Paradise Cove (1999)
Masked and Anonymous (2003)

“এ বছর জুলাইয়ে যখন নিউ ইয়র্কে আছি, হঠাৎ খবর পেলাম, ব্রুকলিনে গাইতে আসছেন ডিলান। তিন ঘণ্টার শো, একাই গাইবেন। খোঁজ নিয়ে দেখলাম, অবাক কাণ্ড! টিকিটের দাম খুব বেশি নয়! তা হলে তো এ সুযোগ ছাড়ার মানেই হয় না! প্রায় কেটেই ফেলছিলাম টিকিট, শেষ মুহূর্তে হাত আটকে গেল আপনা থেকে। থাক। এত এত দিন ধরে এই একটি মানুষের একখানা মূর্তি তৈরি হয়েছে বুকের ভেতর, সেটাকে আর এই বয়সে এসে মিলিয়ে দেখতে ইচ্ছে করল না। পারফরম্যান্সের দিক থেকে ডিলান তাঁর শ্রেষ্ঠ সময় পেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু আমার ভাবনায় তিনি চিরযৌবনের অধিকারী। এই তীব্র ভালবাসার অভিমানী দূরত্বটুকুই তো এক জন অনুরাগীর সম্পদ।

দূরত্ব বললাম বটে, কিন্তু আমরা যখন বড় হচ্ছি, তখন হাতে গোনা আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বব ডিলান ছিলেন প্রথম সারির। সকলের নয় অবশ্য, যারা একটু আধটু গানবাজনার খোঁজখবর করি, তাদের বন্ধু হয়ে উঠতে ডিলানের যে-কোনও একখানা গানই যথেষ্ট ছিল। কত কত ঝগড়ার, প্রেমের, চিঠি চালাচালির, মন খারাপের আর কান্নার সাক্ষী থেকেছেন দূরবর্তী এই ডিলান, যিনি আদতে ভীষণ কাছের একজন মানুষ। পরে ভেবে দেখেছি, কেন হয়েছে এমনটা? কিছু কিছু মানুষের শিল্পের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, আমি তো এই কথাই বলতে চেয়েছিলাম। ডিলানের গান কিন্তু তার উল্টো পথেই হেঁটেছে। তাঁর কলম, তাঁর গিটারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মনে হয়েছে, এত দিন যা ভেবেছি, এ তো তা নয়! কিন্তু এ বার থেকে এইটেই আমারও কথা। আমাদের সকলকে নিজের ছাঁচে আস্তে আস্তে ঢেলে নিচ্ছিলেন গান লিখিয়ে খ্যাপাটে মানুষটি।”

উদ্ধৃত অংশটুকু কবি শ্রীজাত আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছিলেন। নোবেল পাবার পর লক্ষ্মীপুজোয় চালের গুঁড়ো দিয়ে ডিলানের কবিতা আলপনায় এঁকেছিলেন। শ্রীজাত উদ্ধৃত করার কারণ লেখাটার সাথে আমার অনেকটাই মিলেছে। এই “এত দিন যা ভেবেছি, এ তো তা নয়! কিন্তু এ বার থেকে এইটেই আমারও কথা” লাইন দু’টো ছাড়া। তাহলে কেন আমি ডিলানকে এত ভালোবাসি?

ডিলান সর্বকালের সেরা প্রোটেস্ট সং-রাইটার, কাউন্টার কালচার মুভমেন্টের পুরোধা ব্যক্তি, ‘প্রজন্মের কণ্ঠস্বর’, ইন্টেলেকচুয়াল রকের স্রষ্টা, র‍্যাঁবোর কবিতার সাথে তাঁর লিরিক তুলনা করা হয়…এজন্য?

নাকি তিনি বিদ্রোহী, কখনও তাঁকে নিয়মে বেঁধে রাখা যায়নি, ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে গিয়ে দীর্ঘ এগারো মিনিটের গান পর্যন্ত করেছেন, নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে প্রথম ইলেকট্রিক গিটার হাতে মঞ্চে উঠে ‘জুডাস’ গালি খাবার পর ‘প্লে ইট ফাকিং লাউড’ বলে গান শুরু করে দেবার জন্য? তারুণ্যের একেবারে শুরুতে মাত্র দু’টো অ্যালবাম রিলিজ করে কিংবদন্তিতে হয়ে ওঠার কারণে? Subterranean Homesick Blues’র মাধ্যমে পৃথিবীর প্রথম র‍্যাপ গানের সূচনা করবার জন্য? কিংবা প্রথম ফোক-রক ধারা তৈরির জন্য? কনসার্ট ফর বাংলাদেশে স্পেশাল অ্যাপেয়ারেন্সের জন্য? চিরস্থায়ী রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিলোনা, শিল্পীর কাছে To know’র চেয়ে To feel বেশি জরুরী, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কথা বললেও একজন আর্টিস্ট এবং অ্যাকটিভিস্টের মধ্যের পার্থক্য বোঝার জন্য, জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা কখনও ছিলোনা, ফ্যান কিংবা অর্ডিয়েন্সের মন না জুগিয়ে নিজের মতো করে গান করেছেন সারাজীবন, তাই?

ডিলান হলো (তাঁর ভাষায়) ‘The Man in Me’!

ফেসবুকের কোথাও একদিন ‘Watching the River Flow’র অনুবাদ পড়ে ভালো লেগেছিলো, তারপর গানপারে প্রকাশিত একটা ইন্টারভিউয়ের (জোসেফ হাসের সঙ্গে) অনুবাদ। (https://gaanpaar.com/bob-dylan-interview-in-bangla-by-rahim/)

ওখানেই আমার সাথে বেশকিছু মিল পাই। তারপর ইন্টারভিউই পড়ে ফেলি ক’টা (এর মাঝে অবশ্য গান-টানও ঘাঁটছিলাম)। এমন অনেক বিষয় আছে যেসব আমি বুঝিয়ে বলতে চাই,কিন্তু পারিনা। ডিলান পড়লে মনে হয় আমি যা বলতে চেয়েছিলাম (এই যেকোনো সাধারণ বিষয়ে), তাই-ই আগে থেকে বলে রাখা!

ছোটবেলা থেকেই শুনতে হয় পৃথিবীতে নাকি আমি একমাত্র প্রাণী যে কিনা এর’ম, পরে দেখছি ডিলানও (অবশ্য এঁকে বোঝা কঠিন)…ভালো লাগে, একজন তো আছে, এখনও বর্তমান! কোথাও না কোথাও! কেন যেন মনে হয় সাইকোলজিক্যালি একই আমরা!

অঞ্জন দত্ত একবার লিখেছিলেন, “সকলের সঙ্গে, সকলের মতো ভাবার কোনো ইচ্ছে বা প্রিয়জন নেই আমার। আমি খুঁজে চলেছি, চলব।…বন্ধুত্ব, সত্যিকারের বন্ধুত্ব এবং সত্যিকারের ভালোবাসা কী করে হয়, সেটা আমার কাছে ম্যাজিক। আমি জানি কাঞ্চনজঙ্ঘা আছে। আমি দেখতে পাচ্ছিনা, কিন্তু আছে। ওখানে একদিন কোনো একটা ঠিক টাইম এলে, সূর্যটা উঠলে একটা অদ্ভুত ম্যাজিক্যাল মোমেন্ট হয়, আমি জানি। কিন্তু বন্ধু, ভালো বন্ধু কী করে হবে, মানুষকে খুঁজে পাওয়া, এটা ম্যাজিক। এটা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক যে কীভাবে, কখন, কে কার সঙ্গে মিলে যাবে।”

যখন সবকিছু একেবারে নাভিশ্বাস পর্যায়ে চলে যায়, চোখ বন্ধ করি। জাদুকরের মতো টুপির ভেতর থেকে ডিলান বের করে আনেন তাঁর জাদুসামগ্রী। আমি সওয়ার হই তাঁর মায়াতরণীতে। বিড়বিড় করে বলি,

“Take me disappearing through the smoke rings of my mind
Down the foggy ruins of time
Far past the frozen leaves
The haunted frightened trees
Out to the windy beach
Far from the twisted reach of crazy sorrow
Yes, to dance beneath the diamond sky
With one hand waving free
Silhouetted by the sea
Circled by the circus sands
With all memory and fate
Driven deep beneath the waves
Let me forget about today until tomorrow

Hey, Mr. Tambourine Man, play a song for me
I’m not sleepy and there is no place I’m going to
Hey, Mr. Tambourine Man, play a song for me
In the jingle jangle morning I’ll come following you…”

 

(References:

  • Chronicles Volume 1 — Bob Dylan, Simon & Schuster.
  • Lyrics 1961-2012 — Bob Dylan, Simon & Schuster.
  • Why Dylan Matters — Richard F. Thomas, Simon & Schuster.
  • Essential Interviews — Bob Dylan, Edited by Jonathan Cott, Simon & Schuster.
  • A Freewheelin’ Time: A Memoir of Greenwich Village in the Sixties — Suze Rotolo.
  • Bob Dylan — Anthony Scaduto, Abacus.
  • বব ডিলান : অন্তহীন যাত্রাশ্যামশ্রী রায় কর্মকার)

 

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
হাসিন এহ্সাস লগ্ন

হাসিন এহ্সাস লগ্ন

শিক্ষার্থী, রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।