সমসাময়িক কবিতার অক্ষর : আমিনুল ইসলাম 

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

জানলা খোলা মানেই লম্পট জীবনশৈলী এমন নয়, খোলা আকাশে অবারিত যাতায়াত। এই আদান-প্রদান মানুষ-প্রাণী-উদ্ভিদ চরাচর এবং নক্ষত্রলোকে। এই সুবিশাল ব্রহ্মে কবিতা এক অত্যাশ্চর্য লাবণ্য-প্রতিমা। দশভুজার দশহাতে রাবণের দশমাথাযুক্ত জাগ্রত এক আলোর দ্যুতিময়তা। 

সময় প্রেক্ষাপট এবং শিল্পসংস্কৃতি বদলের সাথে সাথে কবিতার বাঁক বদলে যাচ্ছে। আমরা জানি পদার্থের সৃষ্টি ও বিনাশ নেই, প্রতি নিয়ত রূপান্তর ঘটছে। সমস্ত প্রাণ ও আপাতদৃষ্টিতে যা প্রাণহীন বা জড় বলে মনে হয়, তা সবই এক রূপ থেকে অন্যরূপে বদলে যাচ্ছে। কিন্তু অনেকেই ভাববেন এই ‘অক্ষর’ কাগজের উপর কালি কিংবা ডিজিটাল স্ক্রিনে আঙুল চেপে ফুটিয়ে তোলা দৃশ্যের পরম্পরা – এগুলো কী করে জীবন্ত বা জড়পদার্থ হতে পারে। এক বা একাধিক অক্ষর মিলিত হয়ে শব্দের উৎপত্তি, এবং তাকে উচ্চারণে প্রাণের প্রতিষ্ঠা, এই প্রাণ ক্ষণিকের, আবার কখনও বা দীর্ঘস্থায়ীরূপে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। এই হয়ে ওঠা একটা সাধনা। সাধনা=অধ্যবসায়।

এই বদলে যাওয়ার সাপেক্ষে উদ্ভাবিত মনোজগৎ কবিতার কলকাঠি হয়ে ঝরে, কল্প জগৎ থেকে বাস্তব পটভূমি, রাজনীতি সমাজ ও পরম্পরায়। ‘পোস্ট-মর্ডান’ -একটি কালখণ্ড, যে কালের শুরু হয়েছে যা এখনও চলমান, প্রতিনিয়ত বদলে বদলে যাচ্ছে যার পরিসর, যাকে নির্ধারিত কোনো ফ্রেমে বা বোতলে অথবা মোড়কে আবদ্ধ করা যায় না। অবশ্য এই সময়কে অনেকেই অন্য ভাবে ব্যক্ত করছেন বা করবেন আবার কেউ কেউ নিজস্ব মোড়কে বদ্ধ করে লেবেল চিপকে দিতে চায়বেন, চায়তেই পারেন, এটা সহজাতরূপেই মেনে নিতে হবে। না মানলেও কারও কিছু করার নেই, সকলেই স্বাধীন এবং স্বাধীন মতামতের সাদর অভ্যর্থণা গ্রহণ করুন। কবির মননশীলতা কবিতায় প্রকাশ পায় এবং কবিতায় ধরা থাকে সময়ের চিহ্নপ্রকরণ। চিহ্নপ্রকরণগুলিও চলমান সময়কে আইডেন্টিফাই ক’রে এবং ভবিষ্যতের দিকে ছড়িয়ে দেয় ডালপালা। সমসাময়িক ভাষা যা কবির যাপন ও কবিতায় বলা জীব ও জগতের চিহ্নগুলোকে জীবন্ত করে তোলে। 

পোস্ট-মর্ডান কালখণ্ডের অন্যতম পথিকৃৎ কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক প্রভাত চৌধুরী, যাঁর নামের পাশে সহজাতভাবেই বহুল বিশেষণ অবস্থান করে। তাঁর কবিতার দর্শন এই চলমান পোস্ট-মর্ডান বা ট্রান্স-মর্ডান সময়ে এক অনন্যতা দাবি রাখে। তাঁর গ্রহমণ্ডলে অসংখ্য গ্রহের আবর্তন। তাঁর ভাষার দ্যুতি নির্নিমেষ, অসংখ্য আলোর বন্যায় বয়ে চলা কবিতার এক অনন্য জগৎ। গাছের অসংখ্য পাতায় উদ্বেল আন্দোলন জাগিয়ে রাখা কাব্যিক ভ্রমণ। 

আসুন কয়েকটি পড়ে দেখা যাক…

১.
(এইসব হল্লাগুল্লা/ কপা ২০০৮- প্রভাত চৌধুরী) 

“বৃত্তটি হলুদ হলে হাইডেল পার্ক থেকে শুরু হতে পারে হাঁসেদের হাঁটা,
হাঁস নয় হাঁসের পালক পরে সানসিল্ক হেঁটে যাবে—
ল্যাপটপ পড়ে থাকবে একা, কিঞ্চিত হাইড করা শেখা যায়।
যদি জয়মাল্য থাকে, জয়মাল্য এখানে ছিল না, মেলবক্স থেকে
উঠে এল, যাদের যাবার কথা বৃন্দাবন, তারা বৃন্দা কারাতের কাছে
থেমে গেছে, থেমে যেতে হত মথুরায়, মাদুরাই কংগ্রেসের পর
এসো হল্লা করি, গোল্লাছুট খেলি, ললিপপ নিয়ে মজে থাকি,
আইডল বসে আছ চাঁদ, তুমি টুলবার থেকে আইকনে যাও, আমি
নীলের গামলা থেকে উঠে আসা নীল শৃগালের গল্প বলে যেতে থাকি”

২.
(কাঠের পা, ঘোড়ার পা / কপা / ১৯৯৫ প্রভাত চৌধুরী) 

“আমার একটা পা কাঠের, অন্যটা আরবদেশের এক বাদামি ঘোড়ার

কাঠের পা আর ঘোড়ার পায়ের মধ্যে

একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিস্পর্ধা আছে

তবু দুটো পা-কেই একসঙ্গে হাঁটতে হয়, ছুটতে হয়

এমন কি হাঁটু মুড়ে বসতেও হয়

এই হাঁটু, যার ভেতরে এক মালাইচাকি আছে

আর সেই মালাইচাকিকে ঘিরে আছে এক চন্দ্ৰশোভা

আর চন্দ্রশোভার ভিতর ঠিক কতগুলি রং আছে
তা আমার জানা হল না, হয়ত বা দেখাও হল না”

৩.
(সাক্ষাৎকার / কপা/ ১৯৯৭ প্রভাত চৌধুরী) 

“একবার এক প্যাকেটের ৫২টি তাসের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম
হরতনের সাহেব বলেছিল ও মেরুপ্রদেশের এক সাদা ভাল্লুককে
পোষ মানিয়েছিল, ভাল্লুকটা সাহেবের জন্য প্রতিদিন ধরে আনত
একঝাক গোলাপি মৌমাছি, আর মৌমাছিরা বহন করত সবুজ মধু।
সেই মধু পান করেই নাকি হরতনের সেই সাহেব তাসের প্যাকেটে
বন্দি হয়ে যায়, সেই বন্দিদশা আজও চলেছে।”

৪.
(1/4 ক্রাউন,4F / কপা / ২০১৯ কলকাতা বইমেলা,  প্রভাত চৌধুরী) 

“একটা জার্মান শেফার্ড এবং একটা স্প্যানিয়েল স্পিংজ-কে চিহ্নিত করার জন্য চোখ না থাকাটা জরুরি এটাকে যাঁরা নীতিকথা বলে মেনে নেবেন তাঁরাই বুদ্ধিমান, আর যাঁরা মানতে রাজি নন, তাঁরা চলে আসুন ক্যাথিড্রেল চার্চের গেটে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যে বেহালা বাজাচ্ছে, তাকে মানুষেরা অন্ধ বলে তাকে প্রশ্ন করে জেনে নিন

এদিন ক-টি অ্যালসেশিয়ান আর ক-টিই বা স্পিংজ তার সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে, কোনো ডোবারম্যান এসেছিল কিনা

এক এক জাতের কুকুরের

এক এক রকম গন্ধ

এক এক রকম পদশব্দ

এক এক রকম জ্যামিতি

যে চোখ দিয়ে এসব দ্যাখ্যা যায় এই বেহালাবাদক সেই চোখ অর্জন করেছে”

কবির ভাষা ঊর্মিময় জোছনায় ঢাকা নগ্নতাদের ছায়া অথচ এই ছায়ার আবেশ কখনই অন্ধকার নয়, এই আলো-আঁধার, আবছা-বর্ণের উত্তরণে ঝকঝকে একটা সকাল অপেক্ষা করছে। যাদু ও বাস্তব মিলেমিশে একাকার। ম্যাজিক অর্থাৎ যা দেখা যাচ্ছে এবং যা প্রত্যন্তরে একই সাথে ঘটছে। ম্যাজিক = দুইটি সত্য পাশাপাশি ঘটমান। যা গোচর আবার একই সাথে অগোচর এই রিয়েলিটি সৃষ্টির মধ্যদিয়ে কবিকুল এই সাহিত্য ও শিল্প জগৎ সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। অথচ আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে ম্যাজিশিয়ান, যা আমাদের চোখের সামনে উপস্থাপন করছেন তা মিথ্যা এবং তার প্রত্যন্তরে লুকিয়ে আছে আসল সত্য। আমি ঠিক এভাবে ব্যাপারটিকে মানতে চাই না। একটা ঘটনার আড়ালে ঘটে চলা অন্য একটি ঘটমানতার অবস্থান সুতরাং একটি দৃশ্যের অন্তরালে আর একটি দৃশ্যের সচ্ছন্দ জায়মান হয়ে ওঠা এবং মনে করি দুটি ঘটনাই সত্য। আপাতদৃষ্টিতে একটা মিথ্যের আড়ালে লুকিয়ে সত্যের উদঘাটন। অথচ এই অনুশীলনে মনে হয় দুই সত্যের পাশাপাশি বহমানতা, যেমন নদীর জল ও নৌকো একই সাথে বয়ে চলা দ্বৈরথ। 

এই সময়ের বাংলাদেশের তরুণ কবি বাদল ধারা এক দশকের অধিক সময় ধরে (~) এই চিহ্ন তাঁর কবিতায় ব্যবহার করছেন এবং এর বিস্তারিত ব্যাখাও দিয়েছেন। তিনি তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত এই (~) চিহ্নকে পরিব্রাজক রূপে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কথা বা চেতনামতো শব্দ ও বাক্যের সীমাবদ্ধতাকে তিনি এই চিহ্নের সাহায্যে ভেঙেছেন এবং শব্দ বা বাক্যকে বহুমাত্রিক ডিসকোর্সে তথা ঊর্মিবহুল ও উন্মুক্ত করেছেন এবং এই প্রকরণে সাজিয়ে তুলেছেন সাহিত্যের অঙ্গন। তাছাড়া ইদানিং সময়ে অনেক কবি-সাহিত্যিক এই চিহ্নপ্রকরণগুলিকে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতভাবে ব্যবহার করে চলেছেন তাদের লেখায়। বাদল ধারা এখানে স্বতন্ত্র, কারণ তিনি তাঁর ‘শূন্যতার সার্কেল’ (ঘোড়াউত্রা প্রকাশনি- ২০১৭) কাব্যগ্রন্থে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যখ্যা করেছেন তাঁর এই চিহ্নপ্রকরণের। চলমান এই বহুমাত্রিক ঊর্মিময় জগতে তাঁর সৃষ্টি এই যুগকে যথেষ্টভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। 

কয়েকটি স্পার্ক এখানে পড়লো…

.
( সোনালিহলুদ →  NaCl… / শূন্যতার  সার্কেল /একুশে বইমেলা-২০১৭ / বাদল ধারা )

“আয়নিক বন্ধন থেকে ~ একটি ইলেকট্রন ~ হ্যাক হয়ে গেলে
এক জোড়া পাখি ~ একা হয়ে যায়
একটি পাখি ~ ধীরে ধীরে ~ অস্তিত্ব হারায়
ক্রমাগত স্বপ্নের বায়ুমণ্ডল ~ নুনহীন ~ নুনহীন হয়ে ওঠে “

.
(নিউট্রিনো…/ তিন সমস্ত সাত ভাগের এক /একুশে বইমেলা – ২০১৯ / বাদল ধারা

“একটি বিজোড়ের বর্গ, কিংবা ~ দুটি বিজোড় সংখ্যার ~ যোগফল


একঝাক নিউট্রিনো, আমাকে ভেদ করে 
তোমার হৃৎপিণ্ড ~ ছুঁয়ে আসলো, 
উষ্ণতার রঙ মোহাচ্ছন্ন, ঘোরময়, মাতাল

মিউটেন্ট মন ~ সংগীতের সীমানা ছুঁয়ে, অসীমে, অতীন্দ্রিয়ে”

৩.
( অন্তর্বৃত্ত, / বিশ্বব্রহ্মাণ্ড × শূন্য /একুশে বইমেলা – ২০২১ / বাদল ধারা)

“একটি ত্রিভুজ আঁকো ~ বিষম 
যেকোনো একটি বিন্দুতে ~ আমাকে বসাও, 
আর একটি বিন্দুতে তুমি ~ যে বিন্দুতে আমরা
পৌঁছাতে চাচ্ছি ~ তা ফাঁকা থাক, শূন্য, “

নদীর বয়ে চলা যেমন চিরন্তন এবং শাশ্বত ঠিক তেমনই তার উপর ভাসমান খড়-কুটো, নৌকো, জাহাজ অনুকূল বা প্রতিকূলে বয়ে চলে, এই বয়ে চলাও জায়মান, প্রতিটি পাতায় জাগানো বহুরৈখিক আলোড়ন। এই আলোড়নে জীবনসমুদ্রে জোয়ার আসে। শব্দের স্থিতিশীলতা বা জাড্যতা ভেঙে সচল হয় জীবন। একটা স্রোতের অনুকম্পন সাধনায় ব্রতী হয়ে ওঠে এই জীব তথা জগৎ সংসার।

কবি রুদ্র কিংশুক আর এক পরম্পরার-পরশপাথর। তাঁর অক্ষর ফুরিয়ে যায় না, প্রজ্জ্বলিত দীপান্বিতা তাঁর কবিতায়। এই অভ্যাস কবির অক্ষরে ভেসে ওঠে, কবির জীবন-শৈলীতে জ্বলে ওঠে প্রদীপ। অন্ধকার রাজত্বে দ্বীপ্যমান হয়ে ওঠে প্রকৃতি। তিনি একাধারে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় রচনা করেন তাঁর মৌলিক কবিতা, নিবন্ধ ও প্রবন্ধ এবং সাথে সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে চলেছেন অসংখ্য কবির কবিতা। তাঁর এই কাজ নবীন তথা বাঙালি তরুণ প্রজন্মকে জানার সুযোগ করে দিচ্ছে সমসাময়িক বহির্দেশের কবিদের চেতনা-প্রবাহ। তিনি একাধারে কবি ও সাধক, তাই তাঁর সাধনায় জড়ের অন্দরে প্রাণের সন্তরণ ঘটে। চেতন, অবচেতন ও অধিচেতন  -তাঁর কবিতার শরীরে অলৌকিক আবেশ হয়ে ফুটে ওঠে। যাদু-বাস্তব, গুপ্ত-বিদ্যার নিগুঢ় বন্ধন তাঁর কবিতার আঙ্গিকে ধরা পড়ে।

১.
(ঊর্ণপত্রের কবিতা / পরম্পরা / ২০১১ রুদ্র কিংশুক)

“তালগাছের মাথা দিয়ে

ফুঁড়ে বেরুচ্ছে

মানুষের মুখ

ঝরে পড়েছে তাল, গড়িয়ে যাচ্ছে

আঁটি

ও পাতা

বহুচিহ্ন এই সবুজ চর্যায় মুছে যাচ্ছে হারানোর বেদনা মেজোপিসি বেড়াতে এসেছে তালের বেতাল কাহিনি”

২.
(অনুশীলন ক্যাম্পের মোমবাতি/ অস্ট্রিক/ মাঘ১৪১৪/ রুদ্র কিংশুক) 

” Knowledge, a self-finding and self-unfolding of the spirit.
– The Life Divine, Sri Aurobindo

এই বেঞ্চের উপর আমি আমার হৃৎপিণ্ড

খুলে রাখলাম এই বেঞ্চের উপর আমার গন্ধরাজ বনানী, হ্রদের মধ্যে খেলছে বাড়ি ও উড়ে যাওয়া হাঁস

এই খুলে রাখছি লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, বটফল, দুঃখ-পাওয়া, ভালোবাসাবাসি, হরীতকী, সবকিছু ছুঁয়ে থাকা জল, যার আলাদা গল্প নেই, সবকিছুর ভিতরে তার গল্প, গল্পের ভিতর সবকিছু,

চিরপরিচিত জবাগাছ নতুন খেলছে,

হৃদয়, লাল জবাগাছে যেকোনো দিন সাদা ফুটতে পারে…”

৩.
(এওরেদিকে/ পসেইদনের ঘোড়া/ ধানসিঁড়ি / ২০১৫ -রুদ্র কিংশুক)  

“মৃত্যুর হাত থেকে ফেরাবার মন্ত্র জানে
এই অলীক বাঁশি, সুরের সেতু রচনা
মৃত্যুহীন অমরাবতী, ফুরাবে না প্রেম, কুসুমের মাস

এভাবেই মৃত্যুর ভেতর হেঁটে যেতে যেতে
অক্ষরের ফল ফেটে যায়,
বিছনের মাটি হাত পেতে নিতে চায় তোমায়…”

মানব শরীর তথা এই পৃথিবীর সমস্তকিছুই ক্ষণিকের অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী। অথচ আমরা যারা (মানুষ) চেতনার আলোয় আলোকিত তারাই নিজে স্থায়ী হতে চায় এবং আমাদের উদ্ভাবিত বস্তুর স্থায়ীত্ব চাই-  এই নিছক চাওয়া মূলত মূল্যহীন এটা আমাদের অগোচরের জমে থাকা অন্ধকারের ঈঙ্গিত। এ অন্ধকার ঘোঁচাতে হলে আরও দৃঢ়ভাবে শোষণ করে নিতে হবে সূর্যালোক। অনাদি আলোয়, জীব ও জড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বেলে দিতে হবে সহস্রদীপ। কবিতাও তেমনই কবির যাপন। কবিতা যাপন হতে হবে। যাপনে কবিতা হতে হবে। আবার নির্দ্বিধায় এটাকে জীবনশৈলী রূপেও ব্যবহার করা যেতে পারে।  এটা যে-যেভাবে অনুশীলন করবে, ভাঙবে-গড়বে, গড়বে-ভাঙবে, নিজের মতো আঠা-লাগাবে। জড়ের ভেতর প্রথিত সূর্যের আলোকপ্রভা সঞ্চয় হয়ে ওঠে, জীবন ঢলে মৃত্যুতে এবং কিছুটা পোড়া কিছুটা উদ্বায়ী কিছুটা ছাইভষ্মে রূপান্তরিত হওয়া কিংবা সমাধিস্থ হয়ে যাওয়া। তারপর জড়বস্তুর তিনটে রূপ তথা কঠিন তরল ও বায়বীয়। এই রূপান্তরে আপামর পৃথিবী সামিল। প্রথিত শক্তি যা সঞ্চয় হয়েছিল তা ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পদার্থের ভেতর থেকে অক্ষরের জাড্য ধর্ম ভেঙে সচল শব্দার্থের রূপান্তরে, কবিতাও এই প্রকরণে সামিল। যাঁরা কবি তাঁরা এই অগ্রসরতায় সামিল। তাঁরা নিরবিচ্ছিন্নতায় সময়কে একটু একটু করে এগিয়ে দেয়। এই রিলে দৌড়ে আসুন আরও কয়েকটি ডুবসাঁতারে অতিক্রম করি আকাশ ~

কবি স্বপন দত্ত এখানে সহজাতভাবেই অংশ নিলেন। তাঁকে বলপূর্বক বা অনুগ্রহপূর্বক আমন্ত্রণের মধ্যদিয়ে ডেকে আনা নয়, এটাও তাঁরই এক ম্যজিক রিয়েলিটি বা ভরহীনযাদুবাদ(Masslessmagic)। প্রভাত চৌধুরীর মতে স্বপন দত্ত এই সময়ের অন্যতম কবি। তাঁর কবিতা এযাবৎ যদিও সেরকম বিশেষ পড়া হয়নি, এবং এখনও হয়তো অনেকেই এড়িয়ে যান। কারণ তাঁর কবিতার যে দীর্ঘ আকৃতি বা রূপ সেটা দেখেই ভয় সংশয় তৈরী হয় মনে, শুরু করলে শেষ হবে তো! কিন্তু যখন ব্যক্তি স্বপন দত্ত ধীরে ধীরে বন্ধুরূপে আকাশ মেলে ধরলেন, তখন বৃষ্টি রোদ সব নিভে গেল। সহসা তাঁর কবিতায় প্রবেশ ঘটল। মগ্নতা মিশে আছে তাঁর কবিতায়। কবিতা হয়ে ওঠেছে অসংখ্য দৈন-জীর্ণ-শীর্ণ সংখ্যাগুরু মানুষের তথা জীবজগতের। তাঁর কবিতার বহুরৈখিকতায় জেগে ওঠে অসংখ্য জীবন। জীবন তো তুচ্ছ নয়, তাই তাঁর কবিতায় জীবনের পরিপূর্ণতাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। তথাকথিত এলিট সম্প্রদায়ের কথা নয়, হাওয়াই চটিতে ভুলবশত পা-গলানো প্রতিকৃতির দিকে ঝুঁকে পড়া জলরাশির দিকে তাঁর দৃষ্টি নয়, মাটির কাছাকাছি থাকা নগ্ন পা ও ওই পায়ে স্বাবলম্বি হয়ে ওঠা দিন-আনা, দিন-খাওয়া মানুষের আনন্দ সুখ জ্বালা যন্ত্রণা ফুটে ওঠে তাঁর কবিতায়।  

কয়েকটুকরো সাজানো হল…

১.
(একদিন তো / অমিতা / কপা ১৪২৮ শারদীয়সংখ্যা- স্বপন দত্ত)

“শেষ ব্যথার মুখোমুখি হতেই হবে কিন্তু সেদিন যদি

মানুষের

পৃথিবীতে

মানুষ নেই হয়ে যায়…”

২.
(এরপর যা দাঁড়ালো / অমিতা / কপা ১৪২৮ শারদীয়সংখ্যা-স্বপন দত্ত) 

“আমি মাংসের ভেতর কী যেন কী একটা জানলা ফাঁক করে ঠাণ্ডা শান্তি ঢোকাতে গিয়ে খুন হয়ে গেলাম শরীরটা দেখল শরীরটা আর শরীরে নেই”

৩.
(কিন্তু এখন আমি কোথায় / অমিতা / কপা ১৪২৮ শারদীয়সংখ্যা-স্বপন দত্ত) 

“তল অতল গভীর খুলে দিচ্ছ তুমি
রঙিন ঢঙিন ঢুকছ বেরুচ্ছ
তুমি এই, এই তুমি
এই যে আমিটাকে ধুচ্ছ মুচ্ছ তীব্র
আনন্দ যন্ত্রণা খাচ্ছ খাওয়াচ্ছ
এই মর্মর সময়
তুমি-টা ঠিক কীসের মতো”

কবি নিজে নিজেই দায়িত্ব নেন, তাঁকে আক্ষরিক কেউ বাধ্য করেন না, তিনি নিজের দায় অনুভব করেন এই সুবিশাল ব্রহ্মাণ্ডের কাছে, প্রকৃতির কাছে তথা সর্বশক্তিমান নিজের অন্তরাত্মার কাছে তাই সে অবিচলিতভাবে এই দায়ভার সহাস্যে বহন করেন।

দর্শন ও কবিতা, বিজ্ঞান ও কবিতা বা দর্শন ও বিজ্ঞান এবং জীবন ও দর্শন মিলেমিশে কবিতার স্নোফল। 

কবি সমরেন্দ্র রায়-এর অমোঘ সান্নিধ্যে পুনর্জাগরণ ঘটলো। তাঁর কবিতা মানুষের কবিতা, জীবনের কবিতা, বিদগ্ধজনের জীবনশৈলীতে পরিপূর্ণ জীবনচর্চার কবিতা। তাঁর জীবন সংগ্রামে ওঠে আসে ভিটে-মাটির কথা। মাটি হারানো মানুষের যন্ত্রণা, মাটির কথা, কবির জীবনের এক অমোঘ সত্য যা তিনি সহ্য করেছেন অনায়াসেই। অথচ তিনি দিকভ্রষ্ট হননি, সত্যকে তুলে ধরেছেন ঠাকুরের আসনে। কঠিন সংগ্রামী কবি সমরেন্দ্র রায় দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি যমরাজকেও হারাতে সক্ষম। এক অপ্রতিরোধ্য ঐশ্বরিক মানষিক ক্ষমতার অধিকারী তিনি। কবি মাটির সহবৎ জাগিয়ে রাখেন প্রতিনিয়ত। মাটির স্নিগ্ধতা এবং তার ভেতর লুকিয়ে থাকা সুপ্ত-জীবন ও যাদুঘরের সন্ধান পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। 

নদী উপচে কিছু জল গড়িয়ে পড়লো…

১.
(চোখ-অন্তর্জাল / কপা / কলকাতা বইমেলা ২০১৯-সমরেন্দ্র রায়)

“আমাদের চোখ সবসময়ই খোলা থাকে।
খুলে রাখাটাই বিধিনিষেধ, অথচ
আরশিবলয়ে মজে থাকে অন্ধকার, ওখানে
অগুনতি তারা পাশাপাশি ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা করে”

২.
(পাখি ও মানুষ / চোখ অন্তর্জাল / কপা / কলকাতা বইমেলা ২০১৯- সমরেন্দ্র রায়) 

“আমি শুনি ঘুঙুরের শব্দ ব্যথাতুর প্রতিধ্বনি।
মনখারাপ হয়। নিজেকে চিনতে চিনতে হানাহানি
দেখি। মেপে রাখি নিরেট হৃদয়ের টানাপোড়েন।
অনেকদিন হল হারিয়েছি বটতলার পাঠশালা।
এখন দেখি কলরবে মুখরিত ছালচটা পুরোনোদেয়াল।
খসে খসে পড়ে যাবতীয় অন্ধকার। ভেবে দেখি
যা কিছু অবয়ব সবটাই খোলস। দু-হাত
দূরের বাসিন্দারাও ক্রুদ্ধ চাহনিতে দেখে নেয়
এ-পারের বসতিকঙ্কাল। কেননা…
আজ-অবধি আমাদের চোখ যাযাবর পাখি দেখেনি।”

৩.
(নিজস্ব ভাবনা/ চোখ অন্তর্জাল / কপা কলকাতা বইমেলা ২০১৯- সমরেন্দ্র রায়) 

“আমি ভুলে যেতে চাই এসব কথার কথা।
হতাশায় শুয়ে আছে স্মৃতি বিড়ম্বনা।
দু-মুঠো খাবার পেলে জেগে ওঠে চরাচর।
আমি ছুটি এলোমেলো পথছোটে শাখা-প্রশাখার।
ঘুম আসে নিমগ্ন মরণ প্রত্যাশায়।

কার জন্য অপেক্ষায় থাকা, এতদিন যেমনটি ছিলে”

কবি তাঁর লেখায় নিজেকে দেখতে পান, তাঁর কাছে তাঁর লেখা আয়নার মতো নিজের সামনে নিজেকে উদ্ভাসিত করে তোলে। এই আয়নায় যত জড় ও জীবনের সাদৃশ্য ফুটে উঠবে অর্থাৎ যত অধিক সংখ্যক জড় ও জীবন খুঁজে পাবেন ততই কবির সার্থকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। অথচ স্রোতের অনুকূলে চলা আর প্রতিকূলে চলার পার্থক্য আমাদের সকলেরই অল্প-বিস্তর জানা। এ-সবকিছুকে উপেক্ষা করেও যাঁরা নতুন দিগন্তের দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ডানা, তাদের কাছে কৃতজ্ঞ এই ব্রহ্ম। এক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বায় মিশে যেতে চাওয়া এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে বহুরৈখিক আলোড়ন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তৈরি করা আর এক পৃথিবীর বা অলৌকিককে স্বাগত জানানোর দুঃসাহসিক ঈঙ্গিত এঁকে দিতেই কবির তথা কবিতা নামক অক্ষরের চিত্ররূপ বা প্রতিবিম্ব প্রতিষ্ঠা করাই সহজাত কাজ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে ওঠে।  

রাজনীতি অর্থনীতি শিল্প সংস্কৃতি কৃষি তথা ধর্ম সব মিলিয়ে সমাজের নানান উপকরণের টানা-পোড়েন সহযোগে গড়ে ওঠে মানুষের জীবন। জীবন যে শুধুই রসহীন শুষ্ক ঝরা-পাতা ঠিক তা নয়, সবকিছুর পরও বেঁচে থাকে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভবিষ্যৎ। এসবকিছু মিলিয়ে কবিতার হয়ে ওঠা, কবিতার আদিগন্ত স্রোত। চেতন-অবচেতন-অধিচেতন স্তরের অক্ষর দিয়ে বুনে চলা কবিতা, ছবি বা জীবনদর্শন কবির কলমে, শিল্পীর তুলিতে, অভিনয়ে, সর্বপরি চরিত্রে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে। আর এই আলোক-ছায়ায় নতুন এক অন্তর ও বহির্জগতের সৃষ্টি হয়, সেই জগৎ ও জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধিৎসা রচিত হয় কবিতায়। এ এক অনন্য-অনন্তের যাত্রাপথ, পুঞ্জিভূত চেতনার ঊর্মিমালা। 

আমাদের রাজ্য, জাতীয় তথা বিশ্বের সমসাময়িক রাজনৈতিক নগন্যতা, হিংসা-দ্বেষ-রোষ ছড়ানো অভিসন্ধি দিয়ে বর্তমান সময়কে কলুষিত করা থেকে এবং আমাদের চারণভূমিকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়া, সমবেত লেখক তথা কবিকূল এবং তৎসহ শিল্প-সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন আপামর জনসাধারণের এ-সময়ের অন্যতম দায়িত্ব ও প্রজ্ঞাপন। 

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
আমিনুল ইসলাম

আমিনুল ইসলাম

কবি