Friday, 20 May, 2022

নাটক : হুক্কাহুয়া | অপু শহীদ

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
অলংকরন: রাফি আহমেদ চঞ্চল

১.বিরাট চোখ ধাঁধানো শপিং মল।
সারি সারি ব্রান্ডের দোকান।
২.ফুটপাথে সারি সারি ক্ষুদ্র দোকান। রাস্তায় ভ্যান গাড়ির উপর পণ্য বিক্রি।
৩.আলো ঝলমলে পাঁচতারা হোটেল।
৪.ফুটপাথে ভাতের হোটেল
৫.বিশাল মঞ্চে পাশ্চাত্য সংগীত।
৬.গাছের ছায়ায় বাঁশিওয়ালা।
৭.শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র/ তালপাখা
৮.ঠেলাগাড়ি-এরোপ্লেন।
৯.সারিসারি অ্যাপার্টেমেন্ট।
১০.রাতের ফুটপাথে ঘুমিয়ে থাকা মানুষ।
১১.থ্রি ডি সিনেমা
১২.যাত্রা-থিয়েটার
১২.ভীড়ের রাস্তা
১৩.ফাঁকা রাস্তা যেতে যেতে একটা মঞ্চের উপর গিয়ে থামে।

দৃশ্য ১

৫ জন অভিনেতার একটা দল চরিত্র পাল্টে অভিনয়টা করবে।

ক.মঞ্চে কিছু মানুষ বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল করছে। যেন এরা কেউ মানুষ নয় অতিলৌকিক কেউ।

খ.চলতে চলতে একজনের ইঙ্গিতে সবাই থেমে যায়। আবার চলে। আবার থামে। নির্দেশ মেনে অঙ্গভঙ্গি করে।

গ.৩ ফিট উচ্চতার একটা দরজার ফ্রেম বসানো হয়। একটা মানুষের মাপের মাটির মূর্তি এনে ফ্রেমের বাইরে রাখা হয়। দাঁড়িয়ে থাকা একজন দ্বিধাগ্রস্থ। বারবার মাথা নাড়িয়ে না না করতে থাকে। সেই প্রধান একজন ইঙ্গিত করে। বাকীরা ফ্রেমের ভিতর দিয়ে উপুর হয়ে বেরিয়ে যায়।
দ্বিধাগ্রস্থ সেই একজন দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমে যেতে চায় না। পরবর্তিতে প্রধানের ইঙ্গিত মেনে নেয়।
ফ্রেমে প্রবেশের সময় পিছন দিকে মাথা ঝুকিয়ে প্রথমে বাম পা তারপর ডান পা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কোরাস দল গান ধরে।

   গান :নিজের আদল মানুষররূপে 
                  গড়াইছে জগতময়
        নইলে কি আর ফেরেশতাদের 
                  সেজদা দিতে কয়। 

দৃশ্য ২

দুইজন গোর খোদক।
কবর খুড়তে খুড়তে কথা বলছে। কখনও দ্রুত। কখনও বা ধীরে। কখনও উত্তেজিত। কখনও ক্লান্ত। কখনও ক্রোধ। কখনও স্বাভাবিক। শান্ত।

১ম ॥ সবাইকেই শেষ পর্যন্ত শুয়ে পড়তে হয়।
২য় ॥ বিশ্রাম। চিরবিশ্রাম।
১ম ॥ সকলেই বলে পৃথিবীটা ভাল নয়। কিন্তু-
২য় ॥ কিন্তু কি
১ম ॥ পৃথিবী ছেড়ে যেতে চায় না। কান্নাকাটি করে।
২য় ॥ সে একটা মায়া তৈরি হয় বলে
১ম ॥ শেষ পর্যন্ত কোথায় যায় এরা
২য় ॥ অনেক অনেক দিন পর আবার হয়তো কোনও কোনও মৃত কোষ প্রাণ ফিরে
পায়।
১ম ॥ ঐ যে কুকুরটা দেখছ হয়তো ডাইনোসরের নখের কোনও একটা কোষ ওর
ল্যাজে বসে হাওয়া খাচ্ছে।
২য় ॥ ঐ তো আসতে শুরু করেছে

একটার পর একটা লাশ এগিয়ে আসছে।

কাফন পরা
১ম ॥ এই অপেক্ষা করও
২য় ॥ তোমার শরীরের শ্বেতসার আমিষ ¯েœহ শর্করা নুন প্রোটিন সব শীঘ্রই নিরস্ত্র হয়ে যাবে।

কাফন ছাড়া
১ম ॥ এত তাড়াহুড়া করছ কেন
২য় ॥ পৃথিবী এবং মহাকাশ।
১ম ॥ দাসপ্রথা বা সাম্যবাদ।
২য় ॥ সকল থিসিসের মৃত্যু ঘটবে।
কোরাস : সেই অন্ধকার কৌম সমাজে মৃত্যু- মৃত্যু এবং মৃত্যুর দ্বৈতাদৈতবাদের
সংগমে লিপ্ত হবে।

বিভিন্ন কণ্ঠ ॥ সময় প্রবহমান। দুর্গন্ধ ছড়াবে। সময় এগিয়ে যাচ্ছে।
১ম ॥ বিচলিত হবেন না। আপনারা যদি মনে করে থাকেন সময় কেবল ভবিষ্যতের
দিকে যায় তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই সময় এমন সরলরৈখিক নয়।
২য় ॥ দেশকাল বক্রতার মধ্যাকর্ষণে সময় কখনও কখনও অতীতের দিকে ধাবমান
হতে পারে।

কোরাস : ১ হাজার ৪৯। ১০ হাজার ৭৭। ৯৩ হাজার। ১ লক্ষ ১৭ হাজার। ৩ লক্ষ।
৫ লক্ষ। ১০ লক্ষ ১৭ হাজার ৭৩। ২০ লক্ষ। ৪০ লক্ষ। ৫০ লক্ষ।

বিভিন্ন জায়গা থেকে লাশ। অফিস। বাড়ি। হাসপাতাল। কোর্ট।

লাশ দুইজন দুলিয়ে দুলিয়ে দূরে ছুড়ে মারছে।

॥ যা যা যা গঙ্গায়
॥ যা যা যা তিস্তায়
॥ যা যা যা শূন্যে
॥ যা যা যা আসমানে
॥ যা যা যা কবরে

কবরে শোয়াতে শোয়াতে কথা বলবে।
১ম ॥ মরে গেছে
২ম ॥ কেউ মরে যায় না। মেরে ফেলেছে।
১ম ॥ কে? কারা?
২ম ॥ প্রশ্ন করার কি দরকার সৎকার করে দে।
১ম ॥ আবার জন্মাবে
২ম ॥ যা ছিল তা তো আর হবে না।
১ম ॥ না হোক অন্য কিছু হবে।
২য় ॥ কিছুটা গাছ। কয়েকটা পোকা। সাপ। ব্যাঙ। শরীরের মাংসগুলো কেচো হয়ে
মাটি খাবে।
১ম ॥ শরীরে কী কী ছিল
২য় ॥ কার্বন। আয়োডিন।
১ম ॥ সোডিয়াম। ফসফরাস।
২য় ॥ গন্ধক। পটাশিয়াম।
১ম ॥ লোহা- লোহা ছিল?
২য় ॥ ৩ গ্রাম
১ম ॥ মাত্র। বোধ ছিল বোধ।
২য় ॥ দশমিক শূন্য শূন্য তিন গ্রাম। তাও নিশ্চিত নয়।
১ম ॥ মৃতদের এই ঘরগুলো কেমন সুড়ঙ্গের মতো হয়ে যাচ্ছে।
২য় ॥ যাচ্ছেতাই আদ্র আর অন্ধকার।
১ম ॥ অস্বাভাবিক মৃত্যু কেমন একঘেয়ে হয়ে উঠছে।
২য় ॥ কাকে অস্বাভাবিক বলছিস
১ম ॥ এই যুদ্ধশিশু। গুলিবিদ্ধ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা। আগুনেদগ্ধ। মহামারী।
আত্মঘাতী। গাড়ী চাপা।
২য় ॥ তুই কি অন্ধ নাকি রে।
১ম ॥ কেন
২য় ॥ কিছুদিন আগে ইতিহাসকে কবর দিলাম।
১ম ॥ খেয়াল ছিল না।
২য় ॥ ঐ যে দূরে তাকা- সীমানা বরাবর দূরে। উত্তর দিকে। সামান্য দশ ডিগ্রির মত
পূর্বে হেলে যা দেখতে পাচ্ছিস।
১ম ॥ একটা বট গাছ উঠে গেছে। বট থেকে ঝুরিও বেরিয়েছে।
২য় ॥ বটগাছটা সমাজতন্ত্রের কবরের উপর।
১ম ॥ ও
২য় ॥ কি বিশ্বাস হচ্ছে না।
১ম ॥ খুব হচ্ছে। রাজনীতির কবরের পাশে। আমরা তো নিজেরাই হাত লাগালাম না।
২য় ॥ আচ্ছা ইতিহাসের মৃত্যুর পর এতকিছু মনে থাকে কী করে।
১ম ॥ অর্থনীতির ধর্ম নাই। সবাই শত্রু সবাই ভাই।
২য় ॥ যা পায় তা-ই গিলা খায়। আচ্ছা বলতো বর্তমান বাজারে বিপ্লবের দাম কত।
১ম ॥ তা- তা- অনুমান করাটা

কবরে শায়িত ব্যক্তি কথা বলে।
লাশ ॥ ব্যাপারটা আসলে নির্ভর করছে কোন ব্রান্ডের বিপ্লব তার উপর। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর
কুটির বিপ্লব না আঞ্চলিক কোম্পানির আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিপ্লব । অথবা
সরাসরি আমদানিকৃত সা¤্রাজ্যবাদী বিপ্লব তার উপর।
১ম ॥ মরা লাশ কথা বলছে।
লাশ ॥ এখনও কোনও দেশ বাজেট পরিকল্পনায় বিপ্লব বাবদ কোনও বরাদ্দ রাখে না।
তবে অর্থনীতিবিদরা বসে নেই।
২য় ॥ এই তুমি না মৃত।
১ম ॥ এখন তো দেখছি তুমি জীবিত।
লাশ ॥ না না আমি মৃত
১ম ॥ না তুমি জীবিত
লাশ ॥ না আমি মৃত
২য় ॥ আমরা বলছি তুমি জীবিত
লাশ ॥ আমি বলছি আমি মৃত।
১ম ॥ তুমি জীবিত না মৃত তা তুমি বলবে না আমরা বলব।
লাশ ॥ আমি মৃত না জীবিত তা তোমরা বলবে না আমি বলব।
২য় ॥ কী আশ্চর্য
লাশ ॥ কী আশ্চর্য। আমি নিজে জীবিত না মৃত সে সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারব না।
১ম ॥ এই যে তুমি কথা কইছ।
লাশ ॥ কথা কইছি তো তাতে কি। আর কথা কইছি বলেই তো আমি মৃত।
২য় ॥ তাহলে আমরা। আমরাও তো কথা কইছি। আমরা কি মৃত।
লাশ ॥ ভেবেটেবে কিছুই বুঝতে পারবে না। এখন অস্তিত্ব বদল ঘটছে। মূলত সবাই
অস্তিত্বহীন। সর্বদাই একটা মুখোশ পড়ে আছ।
১ম ॥ মুখোশ!
২য় ॥ কোথায়
১ম ও ২য় পরষ্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পরষ্পরের গাল টেনে দেখে। অন্যান্য লাশ একসাথে তাড়া দেয়।
বিভিন্ন কণ্ঠ ॥ কাজে ফাঁকি দিও না।
সৎকারের দায়িত্ব নিয়েছ হাত চালাও।
জীবিতের ধর্ম পালন কর।
কাজ করতে করতে কথা চালাও।
১ম ॥ তোমরা কি আমাদের মুখোশ দেখতে পাচ্ছ।
লাশ ॥ চামড়ার মুখোশ। ভিতরের রক্তমাংস লুকিয়ে রেখেছ। চামড়া সরিয়ে রক্ত বার
করে আন।
২য় ॥ মরে গেলে এরকম অনেক কিছু বলা যায়। জীবিত থাকতে করা যায় না।
লাশ ॥ হাড় মাংস রক্ত কোনও কাজে আসবে না। এসবে প্রসাধন না ঢেলে মগজে
ঢাল।
১ম ॥ বড়োজোর তেরোশ গ্রামের একটা মগজ। তার আবার অর্ধেকটারই ব্যবহার
নাই। সত্যি করে বলোতো তুমি কি বেঁচে আছ।
লাশ ॥ আমি বলে কিছু নেই। সেকেন্ডের কম সময়ে আগের আমি মরে যায়। আর
আমরা সকলে সেই ছোটবেলা থেকে বৃদ্ধকাল পুরোটাকে ধরে নেই আমি আছি।
অনাদি আমি।
২য় ॥ এবার তুমি চুপ কর। মৃতের লাইন বেড়ে যাচ্ছে।
লাশ ॥ তোমরাও জীবিত কেউ নও। যখন এই কবর খুঁড়তে শুরু করেছিলে তখনকার
পৃথিবীর কেউ আর জীবিত নেই। মৃত একটা পৃথিবীতে বাস না করে এই নাও
হাত ধরো- নেমে আস

মৃত ব্যক্তি দুই হাত বাড়িয়ে দেয়। সবাই মৃতের সঙ্গে শুয়ে পড়ে। সবাই শোয়া থেকে মুখোশ পড়ে একেকটা ভঙ্গি করতে করতে উঠে। মিটিং করে। বোকা বোকা আচরণ করে। আনন্দে উল্লাস করে। উত্তেজিত হয়। উত্তেজনার এক পর্যায় মুখোশ খুলে ফেলে। সবাই মিলে গান ধরে।

: আমি। আমি।
[বিভিন্ন সুরে। ছন্দে। রাগে। লয়ে। পাশাপাশি কোরাসের সুরে হুক্কাহুয়া ধ্বনি।]

কোরাস : আপনাদের কোথাও কোনও সমস্যা থাকলে জানাবেন।
আমরা উন্নতমানের স্বাস্থ্য চাষ করছি।
বিনামূল্যে ঘরে ঘরে জ্ঞানপ্যাকেজ প্ৗেছে দেয়া হবে।
এবার থেকে একটি ক্রমোজমকেও আমরা ছাড় দেব না
সকল ক্রমোজমের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো হবে।
[সংলাপগুলো প্রথমটা স্পষ্ট শোনা যাবে। পরেরগুলো ইকো হবে। সেইসাথে মাঝে মাঝে হুক্কাহুয়া। হুক্কাহুয়া শব্দের ধুয়ো ছাপিয়ে উঠে আসবে আরেকটি কন্ঠ।]

কন্ঠস্বর : হারিয়ে যাওয়া শিয়ালদের ফিরিয়ে আনতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছি।

মন্তব্য, এখানে...
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email
অপু শহীদ

অপু শহীদ

নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ও বর্তমান বসবাস ঢাকায়। প্রকাশিত বই: সার্বজনীন নীরবতা চুক্তি (অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৭), চৈত্র বলে মেঘে যাবো, ঈশ্বর পাঠ।